আপডেট ৩ ঘন্টা আগে ঢাকা, ১৭ই অক্টোবর, ২০১৭ ইং, ২রা কার্তিক, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ, ২৬শে মুহাররম, ১৪৩৯ হিজরী

Breaking News
{"effect":"fade","fontstyle":"Bold","autoplay":"true","timer":4000}

প্রচ্ছদ অর্থ-বণিজ্য

Share Button

সোনালী ব্যাংকঃলুটপাট ও দুর্নীতির রামরাজ্য

| ২২:৫৪, অক্টোবর ৯, ২০১৭

ঢাকা । অর্থ-বাণিজ্য । ১০ অক্টোবর । ২০১৭

Image result for sonali bank logo

দুর্নীতি ও লুটপাটের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক। বিশেষ করে এর ২০টি শাখা গলার কাঁটা হিসেবে দেখা দিয়েছে। ব্যাংকটির ১২শ’ শাখার মোট খেলাপি ঋণ যেখানে ১৮ হাজার কোটি টাকা, সেখানে মাত্র ২০টি শাখার খেলাপির পরিমাণ ১৫ হাজার কোটি টাকা, যা মোট খেলাপির ৮৪ শতাংশ। গুরুতর অনিয়ম, প্রতারণা ও জালিয়াতির মাধ্যমে ঋণের নামে বিপুল অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে। এসব অর্থ লুটের সঙ্গে ব্যাংকের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের যোগসাজশের প্রমাণ পেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশদ পরিদর্শন এবং সোনালী ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। ইতিমধ্যে দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের কেউ কেউ দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। আবার কেউ রয়েছেন আত্মগোপনে। অভিযুক্তদের মধ্যে শুধু একজন শাখা ব্যবস্থাপক এবং একজন মহাব্যবস্থাপককে বহিষ্কার করা হয়েছে। কিন্তু তাদেরকে আইনের আওতায় নিয়ে যথাযথ শাস্তির ব্যবস্থা করা হয়নি।

বিশিষ্ট ব্যাংকার সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ  বলেন, বিচারহীনতার কারণে বারবার এ ধরনের ঘটনা ঘটছে। কিছু শাস্তি হলেও তা শাখা পর্যায়ে হয়। কিন্তু পরিচালক বা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের জড়িত প্রভাবশালীদের কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয় না।

সোনালী ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) প্রদীপ কুমার দত্ত  বলেন, কয়েকটি শাখায় অনিয়ম হয়েছে। জড়িত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। অনেকের বিরুদ্ধে মামলা চলমান। এসব অনিয়ম বেশ পুরনো। অনিয়ম বেশি হয়েছে ঢাকা, চট্টগ্রাম এবং খুলনা অঞ্চলে।

অভিযুক্ত শাখাগুলো হল : প্রধান কার্যালয় শাখা, ঢাকাস্থ বৈদেশিক বাণিজ্য কর্পোরেট শাখা, হোটেল শেরাটন কর্পোরেট শাখা, শিল্প ভবন কর্পোরেট শাখা, দিলকুশা কর্পোরেট শাখা, গুলশান শাখা, রমনা কর্পোরেট শাখা, বিওয়াপদা কর্পোরেট শাখা, নারায়ণগঞ্জ ফরেন এক্সচেঞ্জ ও কর্পোরেট শাখা, বঙ্গবন্ধু এভিনিউ কর্পোরেট শাখা, চট্টগ্রাম আগ্রাবাদ কর্পোরেট শাখা, চট্টগ্রাম লালদীঘি কর্পোরেট শাখা, খুলনার দৌলতপুর কর্পোরেট শাখা, দৌলতপুর কলেজ রোড শাখা, খুলনার খালিশপুর শাখা, খুলনা কর্পোরেট শাখা, ফরিদপুর কর্পোরেট শাখা, যশোর কর্পোরেট শাখা ও কক্সবাজার শাখা।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, হলমার্ক আলোচনায় থাকলেও সে কেলেঙ্কারিকেও ছাড়িয়ে গেছে সোনালী ব্যাংকের স্থানীয় কার্যালয়। শাখাটিতে এত বেশি অনিয়ম-দুর্নীতি হয়েছে যে ২০১৬ সাল শেষে এ শাখার ঋণ অবলোপনসহ প্রকৃত খেলাপির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৬৭৯ কোটি টাকা। এরপর সবচেয়ে বেশি ঋণ অনিয়ম হয় রমনা কর্পোরেট শাখায়। শাখাটিতে ২০১৬ সাল শেষে প্রকৃত খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৫০১ কোটি টাকা। এ ছাড়া ব্যাপক দুর্নীতি হয় নারায়ণগঞ্জের দুটি শাখায়। নারায়ণগঞ্জ কর্পোরেট এবং নারায়ণগঞ্জ ফরেন এক্সচেঞ্জ শাখায় প্রায় এক হাজার ৮০০ কোটি টাকার ঋণ জালিয়াতির ঘটনা ঘটে। আদায় না হওয়ায় পুরো অর্থই এখন কু-ঋণে পরিণত হয়েছে। যার একটি বড় অংশ অবলোপনও করা হয়েছে।

সোনালী ব্যাংক ও বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানায়, নারায়ণগঞ্জ ফরেন এক্সচেঞ্জ শাখায় ২০০৫ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত তৈরি পোশাক বিদেশে রফতানি করার জন্য মোট ৫৮টি প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে বিভিন্ন তারিখে বিপুল পরিমাণ ব্যাক টু ব্যাক এলসি (ঋণপত্র) খোলা হয়। কিন্তু এলসির পণ্যে তৈরি পোশাক বিদেশে রফতানি করা হয়নি। আবার গ্রাহক প্রতিষ্ঠানও কোনো দায় পরিশোধ করেনি। ফলে ৬১৫ কোটি ৫৭ লাখ টাকার ফোর্সড লোন (বাধ্যতামূলক ঋণ, যার বিপরীতে দ্বিগুণ জামানত রাখতে হয়) সৃষ্টি করে তা সংশ্লিষ্ট শাখা পরিশোধ করেছে। বিপুল পরিমাণ এ ঋণে যথাযথ জামানত ছিল না। সে কারণে ঘাটতি জামানতের অর্থ প্রধান কার্যালয় (হিসাব ডেবিট করে) থেকে কেটে নিয়ে প্রভিশন সংরক্ষণ করা হয়েছে। উল্লিখিত টাকা আদায় না হওয়ায় সবই এখন তামাদি খেলাপির পথে।

শাখা সূত্র জানায়, তৎকালীন শাখা ব্যবস্থাপক মো. আবদুস সামাদ এবং সিনিয়র অফিসার মো. সিরাজুল হক গ্রাহক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগসাজশ করে পণ্য রফতানি না হওয়ার পরও নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে একাধিক এলসি খুলে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে সীমার চেয়ে বেশি (পেমেন্ট) দেয়ায় এসব দায় সৃষ্টি করা হয়েছে। বর্তমানে ৫৮টি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অর্থঋণ আদালতে মামলা চলমান রয়েছে। এ ঘটনায় আবদুস সামাদকে চাকরিচ্যুত এবং সিরাজুল হককে তিন বছরের জন্য পদোন্নতি স্থগিত করা হয়েছে। বর্তমানে সিরাজুল হক নারায়ণগঞ্জের প্রিন্সিপাল অফিসে কর্মরত।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, সোনালী ব্যাংকের নারায়ণগঞ্জের বৈদেশিক বাণিজ্য শাখায় ৪০টি প্রতিষ্ঠানের কাছে পাওনা মন্দ খেলাপি ঋণ ৫০১ কোটি টাকা অবলোপন করা হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য মেসার্স কারুজ ফেব্রিক্সের প্রায় ৪৫ কোটি টাকা, মেসার্স প্রিমিয়াম নিটওয়্যারের ৪০ কোটি টাকা, মেসার্স এনজেল অ্যাপারেলসের প্রায় ২৮ কোটি টাকা, মেসার্স কটন ফেয়ারের প্রায় ২৭ কোটি টাকা, মেসার্স এসএস নিটের সাড়ে ২৬ কোটি টাকা, মেসার্স এএস নিটওয়্যারের প্রায় ২৫ কোটি টাকা, মেসার্স জিহাদ গার্মেন্টসের প্রায় ২৫ কোটি টাকা, মেসার্স শুভ ফ্যাশনের প্রায় ২৫ কোটি টাকা, মেসার্স দাইয়ান ফ্যাশনের প্রায় ২১ কোটি টাকা, মেসার্স মিলিনিয়াম নিটের সাড়ে ২০ কোটি টাকা, মেসার্স মাসটেক্স ডিজাইনের সাড়ে ১৯ কোটি টাকা এবং মেসার্স রবি অ্যাপারেলের ১৭ কোটি টাকা।

সোনালী ব্যাংকের নারায়ণগঞ্জ বৈদেশিক বাণিজ্য শাখার এক শীর্ষ কর্মকর্তা  বলেন, ৫০০ কোটি টাকার ঋণ অবলোপন করা হয়েছে। শাখাটিতে খেলাপি ঋণ রয়েছে ৯২ শতাংশ। একইভাবে খুলনা কর্পোরেট শাখায়ও যাচাই-বাছাই না করে অনিয়মের মাধ্যমে দেয়া ঋণের প্রায় ৮১২ কোটি টাকাই এখন মন্দমানের খেলাপি।

সূত্র জানায়, সোনালী ব্যাংকের খুলনা অফিসে মহাব্যবস্থাপকের (জিএম) দায়িত্বে থাকাকালীন ব্যাপক অনিয়ম করেন নেপাল চন্দ্র সাহা। দৌলতপুর এবং খুলনা কর্পোরেট শাখাসহ বিভিন্ন শাখায় প্রায় ৬৭৫ কোটি টাকার ঋণ অনিয়ম করেন তিনি। ঋণ অনিয়মের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুদকের মামলায় আসামি থাকায় ব্যাংক তাকে সাময়িক বহিষ্কার করেছে। খুলনা অফিসের বর্তমান জিএম মোশাররফ হোসেন যুগান্তরকে বলেন, সাবেক জিএম নেপাল চন্দ্র সাহা দুদকের মামলার আসামি। তিনি ব্যাংকিং কর্মকাণ্ডের বাইরে আছেন। কারণ কোনো মামলার আসামি হলে সাসপেন্সি (বহিষ্কার) কার্যকর হতে শুরু করে।

সূত্র আরও জানায়, অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে বঙ্গবন্ধু এভিনিউ কর্পোরেট শাখা ৫৫৯ কোটি, আগ্রাবাদ কর্পোরেট শাখা ৫০৩ কোটি, বৈদেশিক বাণিজ্য কর্পোরেট শাখা ৫০২ কোটি, লালদিঘি কর্পোরেট শাখা ৫১৪ কোটি, দৌলতপুর কর্পোরেট শাখা ৪৭১ কোটি, শিল্প ভবন কর্পোরেট শাখা ৪৬৭ কোটি, দৌলতপুর কলেজ রোড শাখা ৩৪৩ কোটি, দিলকুশা কর্পোরেট শাখা ৩১৩ কোটি, ফরিদপুর কর্পোরেট শাখা ১৮৯ কোটি, যশোর কর্পোরেট শাখা ১০৫ কোটি, কক্সবাজার শাখা ৯৬ কোটি, খুলনা খালিশপুর শাখা ৭২ কোটি, গুলশান শাখা ৬৭ কোটি এবং বিওয়াপদা কর্পোরেট শাখার ঋণ অবলোপনসহ প্রকৃত খেলাপি রয়েছে ৫৫ কোটি টাকা।

সূত্র জানায়, সোনালী ব্যাংকে পুরনো অনিয়মগুলো হয়েছে সাবেক এমডি হুমায়ূন কবিরের আমলে। হলমার্কের জন্যও তাকে দায়ী করা হয়। কিন্তু তিনি বর্তমানে পলাতক। সে কারণে তার মন্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি। এ ছাড়া বিদেশে থাকায় বর্তমান এমডি ওবায়েদ উল্লাহ আল মাসুদের বক্তব্য নেয়া যায়নি। সূত্র বলছে, খেলাপি ঋণে জর্জরিত ২০ শাখার মধ্যে হোটেল শেরাটন কর্পোরেট শাখাও (রূপসী বাংলা) রয়েছে। যেখানে সাড়ে চার হাজার কোটি টাকার হলমার্ক কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটে। ২০১২ সালে হলমার্ক কেলেঙ্কারির ঘটনায় আজও অভিযুক্তদের কারও সাজা হয়নি। তবে হলমার্কের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) তানভীর মাহমুদ এবং চেয়ারম্যান জেসমিন ইসলাম জেলে রয়েছেন।

বড় বড় ব্যাংক কেলেঙ্কারির পেছনে সরকারের প্রভাবশালীরা জড়িত। এর অন্যতম উদাহরণ হল হলমার্ক কেলেঙ্কারি। দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ব্যাংক কেলেঙ্কারির এ ঘটনায় টাকা তুলে নেয়ার সুযোগ করে দিয়েছিলেন সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাই। ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদের কয়েকজন সদস্যও তা জানতেন। হলমার্কের এমডি তানভীর মাহমুদ আদালতে দেয়া জবানবন্দিতে পরিচালনা পর্ষদ সদস্য ও আওয়ামী লীগ নেতা সাইমুম সরওয়ারের নাম বলেছিলেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *







পাঠক

Flag Counter



Developed By : ICT SYLHET

Developer : Ashraful Islam

Developer Email : programmerashraful@gmail.com

Developer Phone : +8801737963893

Developer Skype : ashraful.islam625

error: Content is protected !!