৭ই নভেম্বর জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস এবং সার্বভৌমত্ব প্রসঙ্গ

প্রকাশিত: 11:27 PM, November 7, 2017 | আপডেট: 11:27:PM, November 7, 2017

মোঃ শামীম হোসেন (বিদ্যুৎ):

 

বিপ্লব এবং সংহতি বাংলাদেশের মানুষের জন্য এক বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আমরা ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার স্বাদ পেয়েছিলাম। কিন্তু কিছু লোক উড়ে এসে জুড়ে বসে ক্ষমতায়। আর ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব অরক্ষিত করে, বলতে পারেন ভারতের কাছে বর্গা দিয়ে নিজের ক্ষমতা পাকাপোক্ত করতে চেয়েছিল। তারই ধারাবাহিকতা গর্বিত সেনাবাহিনীকে পাশ কাটিয়ে ভারতের মদদে রক্ষীবাহিনী গঠন, জাতীয় সরকার গঠন না করে একদলীয় বাকশাল তৈরি এই সব করা হয়েছিল দেশের সার্বভৌমত্ব বিসর্জন দিয়ে। ঘাত প্রতিঘাত আর পরিবর্তিত সময়ের প্রয়োজনে ৭ই নভেম্বর বিপ্লব অনিবার্য হয়ে উঠেছিল। এই জন্য সিপাহী জনতা বেছে নিয়েছিলেন স্বাধীনতার ঘোষক ও জাতীয় ঐক্যের প্রতীক মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে। আমরা দেশে দেশে বিভিন্ন বিপ্লবের কথা শুনেছি। ইংল্যান্ডে শিল্প বিপ্লব, ইরানে ইসলামী বিপ্লব, আমেরিকায় অর্থনৈতিক বিপ্লব, সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নে সামাজতান্ত্রিক বিপ্লব ইত্যাদি। বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় দুটি বিপ্লব ঘটেছিল। এক রক্তক্ষয়ী মহান মুক্তিযুদ্ধ যেটি মূলত ২৬শে মার্চ ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা ঘোষণার মাধ্যমে দীর্ঘ নয় মাস সশস্ত্র সংগ্রাম। দুই ১৯৭৫ সালে ৭ই নভেম্বর সিপাহী জনতা সফল বিপ্লব। নিরেট সত্য ইতিহাস হল এই দুই জায়গাতেই মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান ছিলেন আপামর জনসাধারণের চোখের মণি। মহান মুক্তিযুদ্ধে তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং ২৫শে মার্চ ১৯৭১ সালে পাকিস্তানী হায়েনাদের অতর্কিত হামলায় দেশের মানুষ যখন দিশেহারা, রাজনীতিবিদরা যখন নিজের জীবন বাঁচাতে পরিবার পরিজন নিয়ে আত্মগোপনে বা সীমানা পেরিয়ে প্রাণে বাঁচার তৃপ্তির ঢেঁকুর গিলছে ঠিক সেই সময় মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান নিজের এবং নিজের পরিবার পরিজনের জীবনের কথা চিন্তা না করে দেশের মানুষের জন্য তিনি তূর্য কণ্ঠে ঘোষণা করলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা। সারাদেশের মানুষ তাঁর এই স্বাধীনতার ঘোষণা শুনে ঝাঁপিয়ে পড়েন মহান মুক্তিযুদ্ধে। তাঁর সেই তূর্য ধ্বনি আজও মানুষের কানে বাজে। তবে মজার ব্যাপার হল সারাদেশের মানুষ মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে জানলেও কতিপয় লোক যারা ভাবতেও পারেনি দেশ স্বাধীন হবে, যারা ভারতের কিছু নিষিদ্ধ পল্লীতে রঙিন শরাব আর কাদামাটির মত শরীরে লেগে থাকা মাংস পিণ্ডের স্বাদ নিতে মগ্ন ছিল তারা জিয়াউর রহমান নামে কেউ আছে তা জানত না। যারা জিয়াউর রহমান নামে কেহ আছে বলে জানত না অথচ স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশ নিয়েছে বলে দাবী করে তারা আর যাইহোক বাংলাদেশের স্বাধীনতা অস্বীকার করে। মেজর জিয়াউর রহমান এবং বাংলাদেশ ও এর স্বাধীনতা এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। যারা জিয়াউর রহমানকে অস্বীকার করবে তারা মূলত বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে অস্বীকার করে। মহান মুক্তিযুদ্ধে মেজর জিয়াউর রহমানের এই অসামান্য অবদানের জন্য তিনি সমগ্র জাতির কাছে এক জাতীয় ঐক্যের প্রতীক। তাই দেশ যখনই কোন ক্লান্তিকাল অতিক্রম করেছে জিয়াউর রহমান ত্রাতা হয়ে আবির্ভূত হয়েছেন। তেমনি মূলত দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে নতুন করে ক্লান্তিকাল শুরু হয় জাতির জীবনে। পলাতক, আত্ন সমর্পণকারী, দুঃসময়ে দেশত্যাগকারী দালারা যারা ভেবেছিল দেশ স্বাধীন হবে না তারাই উড়ে এসে ক্ষমতায় জুড়ে বসে। যে গণতন্ত্র, অর্থনৈতিক মুক্তি ও সুশাসনের জন্য মানুষ জীবন দিয়ে যুদ্ধ করল অথচ ক্ষমতায় এসে জনগণের কাঙ্ক্ষিত সকল কিছু মাটি করে দেওয়া হল। দুর্ভিক্ষ আর দুঃশাসনে মানুষ অতিষ্ঠ। দেশ স্বাধীন হয়েছিল ঠিকই কিন্তু কার্যত একটি দেশের নিপীড়িত, নির্যাতিত অংশ থেকে অন্য আরেকটি প্রতিবেশী দেশের কাছে পরাধীন বা গোলামী রাষ্ট্রে পরিণত হল। মূলত ১৯৭১ সালে ১৬ই ডিসেম্বর থেকে খুব স্পষ্ট হয়ে যায়। আজ পর্যন্ত জানা গেল না কেন মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক কর্নেল এম এ জি ওসমানী সাহেবের কাছে পাকিস্তানের আত্ন সমর্পণ সম্পন্ন হল না। কেনই বা সেদিন সেই আত্ন সমর্পণ অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক কর্নেল এম এ জি ওসমানী সাহেব উপস্থিত ছিলেন না। কোথায় গেল চুরানব্বই হাজার পাকিস্তানী আর্মির অস্ত্র, গোলা বারুদ, এর কোন সদুত্তর জাতি পায়নি।

 

 

১৯৭১ সালে বাংলার মানুষ স্বাধীনতা বিষয়টা উপলব্ধি করতে পারলেও সার্বভৌমত্ব বিষয়টি ৭ই নভেম্বর ১৯৭৫ সালে মানুষ পুরোপুরি উপলব্ধি করতে পারে। আর এই দুইটি মহৎ বিষয় প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন জাতীয় ঐক্যের প্রতীক, গণ মানুষের হৃদয়ের মণিকোঠায় স্থান করে নেওয়া মহান স্বাধীনতার ঘোষক, বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি, বীর মুক্তিযোদ্ধা, সুশৃঙ্খল ও ন্যায়ের অন্যতম উদাহরণ, বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা, ক্ষণজন্মা এক মহা পুরুষ শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান।

 

 

নভেম্বর মাস বাংলাদেশের জনগণের জন্য জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি’র মাস। ১৯৭৫ সালে ৭ই নভেম্বর সিপাহী জনতার এক সফল বিপ্লবের মাধ্যমে বাংলাদেশের এক নব দিগন্তের সূচনা হয়। এর আগে ৩ নভেম্বর সেনাবাহিনীর দ্বিতীয় ব্যাক্তি মেজর জেনারেল খালেদ মোসাররফের নেতৃত্বে দেশে একটি সেনা অভ্যুত্থান হয়। মেজর জেনারেল খালেদ মোসাররফ সেনাবাহিনীর প্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে অন্তরীন করে নিজেকে সেনাবাহিনীর প্রধান হিসেবে ঘোষণা করে। কিন্তু সেনাবাহিনীর বৃহৎ একটি অংশ এবং দেশের জনগণ রুশ-ভারত আশীর্বাদপুষ্ট এই সেনা অভ্যুত্থান কোন ভাবেই মেনে নেয়নি। ফলশ্রুতিতে ৭ই নভেম্বর সিপাহী জনতা সফল বিপ্লবের মাধ্যমে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করে এবং সৈনিক আর দেশের জনগণ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে রাস্তায় নেমে বিজয় উল্লাস উদযাপন করে। জাতীয় ঐক্যের প্রতীক মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে পেয়ে সমগ্র দেশবাসী আবেগে আপ্লূত হয়ে পড়ে। ব্রিটিশ ভারত, পাক ভারত এবং বাংলাদেশের প্রত্যক্ষ রাজনীতির প্রবাদ পুরুষ মজলুম জননেতা মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী এক প্রশ্নের জবাবে বলেছিলেন “ জিয়াউর রহমানের মত দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি মুক্ত শাসক তিনি আর দেখেননি”।

 

 

জাতীয় অধ্যাপক ড এমাজ উদ্দিন তাঁর এক লেখায় উল্লেখ করেন যে, শেখ মুজিব যে সব ক্ষেত্রে চরম ভাবে ব্যর্থ হয়েছেন জিয়াউর রহমান সেই সব ক্ষেত্রে ব্যাপক ভাবে সফল হয়েছেন। প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দল তাঁর সাফল্যে ঈর্ষান্বিত হয়ে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের বিরুদ্ধে মিথ্যা ও অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছে। পাঠ্যবই ও বিভিন্ন স্থাপনা থেকে জিয়াউর রহমানের নাম মুছে ফেলেছে কিন্তু দেশের মানুষের হৃদয় থেকে কোন দিন জিয়া ও জিয়া পরিবারের নাম মুছতে পারে নাই। বর্তমানে দেশে এক অরাজকতা পরিস্থিতির মধ্যেও জাতীয়তাবাদী শক্তির ঐক্য ও বিপুল জনসমর্থন তারই প্রমাণ।

 

 

অন্য আরেক গুণীজন জাতীয় অধ্যাপক জনাব ড মনিরুজ্জামান মিয়া শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে ধূমকেতু হিসাবে অভিহিত করেছেন।তবে এই ধূমকেতু তীব্র উজ্জল আলো নিয়ে আবির্ভূত ধূমকেতুর মত আবার মানব চক্ষুর আড়ালে চলে যায়নি। এ ধূমকেতু বাংলার আকাশ ছাড়িয়ে বিশ্ব পরিমণ্ডলে এক উজ্জ্বল আলো হয়ে ঝলমল করছে।

 

 

“মিশ্র কথন” বইয়ে লেখক মেজর জেনারেল (অবঃ) সৈয়দ মুহাম্মদ ইব্রাহীম বীর প্রতীক উল্লেখ করেন সেনা নিবাসের ভিতরে ৬ই নভেম্বর জাসদ এবং তাদের গঠিত গোপন সৈনিক সংস্থা ও বিভিন্ন মাধ্যমে লিফলেট বিলি করে। এমন অনেক লিফলেট জনাব ইব্রাহীম দেখেছেন যা ছিল এরকম “সিপাহী সিপাহী ভাই ভাই, অফিসারের রক্ত চাই” ।
৭ই নভেম্বর সিপাহী জনতার সফল বিপ্লবের মাধ্যমে রুশ ভারত আশীর্বাদ পুষ্ট রক্তারক্তির ক্যু ব্যর্থ করে দিয়ে জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে স্বাধীন বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা হয়। ৭ই নভেম্বর ব্যর্থ হলে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব অনিরাপদ হয়ে যেত, তাই ৭ই নভেম্বর বিপ্লব ছিল অনিবার্য। বর্তমান আওয়ামী অবৈধ সরকার আবারও দেশের সার্বভৌমত্ব ভারতের কাছে বিলিয়ে দিয়ে, নিজ দেশের মানুষের উপর নির্মম অত্যাচার, জুলুম চালিয়ে ক্ষমতায় টিকে আছে। দেশের জনগণ আজ ঐক্যবদ্ধ হয়েছে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে। যে কোন সময় গণঅভ্যুথান এর মাধ্যমে এই জালিম সরকার বিতাড়িত হবে এবং দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ও তারুণ্যের অহংকার, আগামী দিনের রাষ্ট্র নায়ক তারেক রহমানের নেতৃত্বে দেশের সার্বভৌমত্ব পুনঃ প্রতিষ্ঠিত হবে। সফল ও সার্থক হউক বিপ্লব ও সংহতি দিবস।

 

লেখকঃ
যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দল, যুক্তরাজ্য

 

 

মতামতঃ লেখকের নিজস্ব । লন্ডন টাইমস নিউজের সম্পাদকীয় নিতির সাথে সম্পর্কিত নয় ।