আপডেট ৫১ min আগে ঢাকা, ২২শে মে, ২০১৯ ইং, ৮ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১৬ই রমযান, ১৪৪০ হিজরী

Breaking News
{"effect":"fade","fontstyle":"normal","autoplay":"true","timer":4000}

প্রচ্ছদ জাতীয়

Share Button

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদ হয় এমপি পরিবারের, নয়তো জামায়াত বিএনপির

| ২১:২৪, জুলাই ২২, ২০১৮

লায়েকুজ্জামান ২৩ জুলাই, ২০১৮

 

 

ডেমরা, দনিয়া, মাতুয়াইল, সারুলিয়া ইউনিয়ন এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৪৮, ৪৯ ও ৫০ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে ঢাকা-৫ আসন। এ আসনের বেশির ভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদ ও পরিচালনা পরিষদের শীর্ষ পদ দখল করে আছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য হাবিবুর রহমান মোল্লার পরিবারের সদস্য কিংবা পরিবারের পছন্দের বিএনপি-জাতীয় পার্টি কিংবা জামায়াতের লোকেরা। এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি বাণিজ্য এবং তহবিল নিয়ন্ত্রণ করেন তাঁরাই।

মাতুয়াইল ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মজিবুর রহমান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘টানা দুইবার দল ক্ষমতায়। কিন্তু ঢাকা-৫ আসনে মনে হয় সেই বিএনপিই ক্ষমতায় রয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও দখলবাজের মতো হয় এমপি পরিবার, না হয় বিএনপির লোকজন জেঁকে বসেছে। কোথাও আওয়ামী লীগের লোকজনের স্থান নেই।’

অনুসন্ধানে জানা যায়, ঢাকা-৫ নির্বাচনী এলাকার বেশির ভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রধান শিক্ষক বিএনপি-জামায়াতের লোকেরা। আর এসব প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পরিষদের সভাপতি হন এমপি পরিবারের কেউ অথবা বিএনপির নেতাকর্মী।

ঢাকা-৫ নির্বাচনী এলাকার সবচেয়ে বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দনিয়া বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ পরিচালনা পরিষদের সভাপতি ছিলেন সংসদ সদস্য হাবিবুর রহমান মোল্লা। উচ্চ আদালতের আদেশের কারণে এ পদ ছাড়তে হয়েছে তাঁকে। বর্তমানে এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সরকারের পক্ষ থেকে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

এলাকার সবচেয়ে নামকরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সামসুল হক খান স্কুল অ্যান্ড কলেজের পরিচালনা পরিষদের সভাপতি এমপি হাবিবুর রহমান মোল্লার মেজো ছেলে মাহফুজুর রহমান শ্যামল। স্কুলের প্রধান শিক্ষক জাতীয়তাবাদী শিক্ষক সমিতি ঢাকা মহানগরের সভাপতি মাহবুবুর রহমান মোল্লা। হাবিবুর রহমান মোল্লার আদি বাড়ি মাতুয়াইলে হলেও পরিবারের সবাই বসবাস করে ফরাশগঞ্জে। এলাকার নেতাকর্মীদের অভিযোগ, শুধু নামকরা এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভর্তি বাণিজ্যের কথা মাথায় রেখে এমপিপুত্র শ্যামল তাঁর ছেলেকে এ স্কুলে ভর্তি করিয়ে পরিচালনা পরিষদের সভাপতি হয়েছেন।

এলাকার আরেক আলোচিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দনিয়া একে স্কুলের পরিচালনা পরিষদের সভাপতি এমপির বড় ছেলে মশিউর রহমান সজল। এই স্কুলের প্রধান শিক্ষক শামসুল ইসলাম এলাকায় জামায়াতপন্থী শিক্ষক হিসেবে পরিচিত।

মাতুয়াইল বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের পরিচালনা পরিষদের সভাপতি বেলায়েত হোসেন যাত্রাবাড়ী থানা বিএনপির সহসভাপতি। স্কুলটির প্রধান শিক্ষক আমিন মিয়া জামায়াত রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।

মাতুয়াইল হাজি আবদুল লতিফ ভুঁইয়া কলেজের অধ্যক্ষ আ খ ম মতিউর রহমান রমনা বটমূলে বোমা হামলা মামলার আসামি। রমনা বটমূলে বোমা হামলার সময়  তিনি সামসুল হক খান স্কুল অ্যান্ড কলেজের ধর্ম বিষয়ের শিক্ষক ছিলেন। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে বিএনপি ক্ষমতায় এলে তিনি মুক্তি পান। পুরস্কার হিসেবে তাঁকে হাজি আবদুল লতিফ কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ নিয়োগ দেন তৎকালীন এমপি সালাহ উদ্দিন। তিনি ভারপ্রাপ্ত হিসেবেই দায়িত্ব পালন করছিলেন। তাঁকে পূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের এমপির সুপারিশে।

এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পরিষদে দীর্ঘদিন ধরে সভাপতির দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন জাতীয় পার্টির ঢাকা মহানগর কমিটির সদস্য সাইফুদ্দিন সাইফুল। সম্প্রতি সভাপতি করা হয়েছে আওয়ামী লীগ মাতুয়াইল ইউনিয়ন কমিটির সদস্য আনোয়ার হোসেনকে। এলাকার নেতাকর্মীরা জানায়, আনোয়ার হোসেন হাবিবুর রহমান মোল্লার ঘনিষ্ঠজন বলে পরিচিত।

যাত্রাবাড়ী আইডিয়াল স্কুলের পরিচালনা পরিষদের সভাপতি এমপিপুত্র মশিউর রহমান সজল। তিনি ডেমরা থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। স্কুল তহবিলের ২০ কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনা নিয়ে বর্তমানে আদালতে মামলা চলছে। মামলার অন্যতম অভিযুক্ত ঢাকা-৫ আসনের সংসদ সদস্য হাবিবুর রহমান মোল্লা। স্কুলটির সাবেক প্রধান শিক্ষক মোহাম্মাদ ইউসুফকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে সম্প্রতি মনির উদ্দিনকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

ডেমরা বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের পরিচালনা পরিষদের সভাপতি জয়নাল আবেদীন রতন বিএনপি ঢাকা মহানগরের সহসভাপতি। কলেজের অধ্যক্ষ ইউনুস মিয়া বিএনপি নেতা।

মাতুয়াইল বালিকা বিদ্যালয়ের পরিচালনা পরিষদের সভাপতি শফিকুল ইসলাম যাত্রাবাড়ী থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক। স্কুলের প্রধান শিক্ষক হাসিনা বেগম স্থানীয় বিএনপি নেত্রী।

মাতুয়াইল আবদুল মান্নান উচ্চ বিদ্যালয় পরিচালনা পরিষদের সভাপতি ছিলেন মাতুয়াইল ইউনিয়ন বিএনপির সহসভাপতি গোলাম মোর্শেদ  অরুণ। স্কুলের অর্থ আত্মসাতের দায়ে তাঁর নামে মামলা চলছে। ফের তাঁকে পরিচালনা পরিষদের সভাপতি করতে তাঁর পক্ষে ডিও লেটার দিয়েছিলেন হাবিবুর রহমান মোল্লা। মামলা চলমান থাকায় সংসদ সদস্যের ডিও লেটার কার্যকর হয়নি। বর্তমানে এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে  অস্থায়ী সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন যুগ্ম সচিব পর্যায়ের একজন সরকারি কর্মকর্তা।

দনিয়া বর্ণমালা স্কুল পরিষদের সভাপতি করা হয়েছে আবদুস সালাম বাবুকে। জাতীয় পার্টির ঢাকা মহানগর কমিটির সহসভাপতি হিসেবে বিএনপিতে যোগ দেন তিনি; কিন্তু কোনো পদ পাননি। আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে বর্তমানে তিনি মহানগর কৃষক লীগের সহসম্পাদক।

যাত্রাবাড়ী শহীদ জিয়া বালিকা বিদ্যালয় পরিচালনা পরিষদের সভাপতি করা হয়েছে যাত্রাবাড়ী থানা বিএনপির সহসভাপতি নজরুল ইসলামকে। এর আগে পরিচালনা পরিষদের সভাপতি ছিলেন যাত্রাবাড়ী থানা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি প্রবীণ নেতা আকবর হোসেন। এ প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষক ফাতেমা বেগম বিএনপি পরিবারের লোক হিসেবে এলাকায় পরিচিত। আকবর হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি পরিচালনা পরিষদে ছিলাম। হয়তো এলাকার সংসদ সদস্যের পরিবারের লোকেরা মনে করেছেন আমি তাঁদের ঘনিষ্ঠজন নই, সে কারণে বাদ পড়েছি।’

এলাকার সাধারণ মানুষ এবং তিনটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বেশ কয়েকজন অভিভাবকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা পরিষদ নিয়ে এমপি পরিবারের টানাহেঁচড়া, পরিষদ বদল ও আর্থিক কেলেঙ্কারির কারণে ঢাকা-৫ নির্বাচনী এলাকার কমপক্ষে তিনটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সুনাম ক্ষুণ্নসহ অভিভাবকরা আস্থাহীন হয়ে পড়েছেন। এ প্রতিষ্ঠান তিনটি হলো—শহীদ জিয়া বালিকা বিদ্যালয়, যাত্রাবাড়ী মডেল হাই স্কুল ও মাতুয়াইল আবদুল মান্নান উচ্চ বিদ্যালয়।

শহীদ জিয়া বালিকা বিদ্যালয়ের পরিচালনা পরিষদ বদলের মাধ্যমে নতুন পরিচালনা পরিষদ তুলে দেওয়া হয়েছে স্থানীয় বিএনপি নেতাদের হাতে। এ নিয়ে ক্ষুব্ধ আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকর্মী।

যাত্রাবাড়ী মডেল হাই স্কুল তহবিলের ২০ কোটি টাকা আত্মসাৎ নিয়ে তুমুল আলোচনা রয়েছে অভিভাবকদের মধ্যে। আবু আশরাফ নামের যাত্রাবাড়ীর একজন অভিভাবক বলেন, ‘যে স্কুলের পরিচালনা পরিষদ এবং শিক্ষক স্কুলের তহবিল চুরির সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে, সেই স্কুলে আমার সন্তান কী শিখবে? আমি আমার সন্তানকে অন্য স্কুলে ভর্তি করিয়েছি। এ ছাড়া স্কুলের ফলাফলও দিন দিন নিম্নগামী হচ্ছে।’

মাতুয়াইল আবদুল মান্নান উচ্চ বিদ্যালয়টিও এখন আস্থার সংকটে পড়েছে। তহবিল চুরির অভিযোগ আছে এমন লোককে ফের পরিচালনা পরিষদের সভাপতি করতে ডিও লেটার দিয়েছেন সংসদ সদস্য হাবিবুর রহমান মোল্লা। এ নিয়ে এলাকার আওয়ামী লীগ নেতারা ক্ষুব্ধ।

ডেমরা থানা আওয়ামী লীগের সাবেক সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য মজিবুর রহমান বলেন, ‘মাতুয়াইলের আবদুল মান্নান উচ্চ বিদ্যালয় পরিচালনা করার মতো অনেক যোগ্য লোক এলাকায় থাকার পরও বিএনপি নেতার পক্ষে সংসদ সদস্যের সুপারিশ কী কারণে তা বোধগম্য নয়। এখন তো স্কুলের কোনো পরিচালনা পরিষদই নেই। এই প্রতিষ্ঠান নিয়ে এক ধরনের অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে।’

ডেমরা থানা যুবলীগের সাবেক সহসভাপতি সাজেদুল ইসলাম বকুল বলেন, ‘বিএনপি আমলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধান শিক্ষক ও পরিচালনা পরিষদে বিএনপির লোক থাকায় আমরা সে সময়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে একটি সভা বা মিলাদ অনুষ্ঠান করার অনুমতি পাইনি। আওয়ামী লীগ আমলেও তারাই আছে। আগামী দিনে দল ক্ষমতায় না থাকলে আমাদের ওরা কোনো সভা করার অনুমতি দেবে না।’

এ বিষয়ে ডেমরা থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ঢাকা-৫ আসনের সংসদ সদস্য হাবিবুর রহমান মোল্লার ছেলে মশিউর রহমান সজল বলেন, ‘আমাদের পরিবারের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। নির্বাচনী এলাকায় কয়েক শ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আছে। আমাদের পরিবারের লোকেরা মাত্র তিনটি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বে। শুধু বিএনপির যাঁরা দায়িত্বে আছেন সেগুলোর কথা বলা হচ্ছে। আওয়ামী লীগের লোকও আছেন, তা সামনে আসছে না।’ তিনি বলেন, ‘বিএনপির যাঁরা এসেছেন তাঁরা নির্বাচনের মাধ্যমে এসেছেন। সে ক্ষেত্রে আমরা কী করতে পারি!’

ডেমরা থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট রফিকুল ইসলাম মাসুদ বলেন, ‘এটা তো ঠিক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালনা পরিষদ ও বেশ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষক হিসেবে বিএনপির পদধারী নেতারা আছেন।’

Comments are closed.







পাঠক

Flag Counter



Developed By : ICT SYLHET

Developer : Ashraful Islam

Developer Email : programmerashraful@gmail.com

Developer Phone : +8801737963893

Developer Skype : ashraful.islam625

error: Content is protected !!