জ্যোতিময় বিজ্ঞানী স্যার আচার্য্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়

প্রকাশিত: ১২:২৪ পূর্বাহ্ণ, আগস্ট ২, ২০১৮ | আপডেট: ১২:২৫:পূর্বাহ্ণ, আগস্ট ২, ২০১৮

এস,এম,আলাউদ্দিন সোহাগ

 

বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতিকে বিশ্বের বুকে উচু করে আত্মপরিচয়ে পরিচিতি করতে যে ক’জন মহাপুরুষ ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করেছেন তাদের অন্যতম স্যার আচার্য্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়। আগামী ২ আগষ্ট তাঁর ১৫৭ তম জন্মবার্ষিকী। তাঁর পিতার নাম হরিশ্চন্দ্র রায়, মায়ের নাম ভুবণ মোহনী দেবী।
১৮৬১ সালের ২ আগষ্ট খুলনা জেলার পাইকগাছা উপজেলার রাড়–লী গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। একাধারে বিজ্ঞানী, শিক্ষক, শিল্লোদ্যোক্তা, সমবায়ী, সমাজসেবক ছিলেন তিনি। ১৮৮৯ থেকে ১৯১৬ সাল পর্যন্ত ২৭ বছর কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজের শিক্ষক। অত:পর ১৯৩৬ সাল পর্যন্ত কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং ১৯৩৭ সাল থেকে একই বিশ্ববিদ্যালয়ে ইমেরিটার প্রফেসর হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। দীর্ঘদিন বর্ণাঢ্য শিক্ষকতার জীবন খুব কম মানুষের ভাগ্যে হয়েছে। তিনি বুঝেছিলেন বাংলায় বক্তৃতা ছাত্রদের অনুধাবনের ক্ষেত্রে সহায়ক। তিনি ক্লাসে বাংলায় বক্তৃতা দিতেন এবং পড়ার সময় দেশের বিভিন্ন বিজ্ঞানীদের জীবন কাহিনী ও সফলতার বিভিন্ন দিক তুলে ধরতেন। ফলে বিশ্বের খ্যাতনামা রসায়নবিদ যেমন- প্রিষ্টলী, লাভয়সিয়ে, শীল, ডাল্টন প্রমুখ বিজ্ঞানীদের সঙ্গে তার আত্মিক পরিচয় ঘটে।
একজন শিক্ষক তার ছাত্রদের কতটুকু ভালবাসতেন বা দিক নির্দেশনা দেন তার প্রমাণ পাওয়া যায় এই ঘটনায় শেরে বাংলা এ-কে-ফজলুল হক ৫-৬ দিন ক্লাসে না এলে তিনি তার বাসায় চলে যান। ফজলুল হক তখন খেলার মাঠে থাকায় তিনি অপেক্ষা করতে থাকেন। ফজলুল হক ফিরে এসে স্যারকে অপেক্ষা করতে দেখে তিনি কখন এসেছেন জানতে চাইলে বলেন, তোমাদের হিসাবে এক ঘন্টা আমার হিসাবে ষাট মিনিট। শেরে বাংলা এ-কে-ফজলুল হক ছিলেন প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের প্রিয় ছাত্র। তাইতো ফজলুল হকের নির্বাচনের সময় নির্বাচনী মিছিলে বৃদ্ধ বয়সে খোলা গাড়ীতে দাড়িয়ে জনগণকে ফজলুল হককে জয়ী করার জন্য কলিকাতা বাসীকে প্রদত্ত আহবান জানান। তিনি বলেন ফজলুল হকের পায়ের নখ থেকে মাথার চুল পর্যন্ত খাটি মুসলমান। ফজলুল হক সাহেবের নিরপেক্ষবাদী মনোভাবের জন্য ভুয়সী প্রশংসা করতেন। শিক্ষক হিসেবে তাঁর নিরপেক্ষকতা এবং ধর্ম বিষয়ে উদারতারও প্রমান পাওয়া যায়।
১৯১৫ সালে কুদরত-ই-খোদা (পরবর্তীতে ডক্টরেট) একমাত্র মুসলিম ছাত্র এম,এস,সি তে (রসায়ন) প্রথম শ্রেণী পাওয়ায় কয়েকজন হিন্দু শিক্ষক তাঁকে অনুরোধ করেন প্রথম শ্রেণী না দেওয়ার জন্য, কিন্তু তিনি রাজী না হওয়ায় তারা প্রস্তাব দেন একজন হিন্দু ছেলেকে ব্রাকেটে প্রথম শ্রেণী দেওয়ার জন্য তিনি সে প্রস্তাবেও সম্মত হননি। আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্রের আর্শীবাদেই বোধ করি ডক্টর কুদরত-ই-খোদা একমাত্র বাঙ্গালী তৎকালীন পাকিস্তানে একজন বিজ্ঞানী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পেরেছিলেন। আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় ও স্যার জগদীশ চন্দ্র বসু একই প্রতিষ্ঠানের সময়কার শিক্ষক ও বিজ্ঞানী ছিলেন। কিন্তু বিজ্ঞান কলেজে আচার্যদেবের সাহচর্যে এবং সহযোগিতায় যারা শিক্ষালাভ করেছিলেন তারাই ১৯১০ খ্রিঃ থেকে ১৯৪০ খ্রিঃ পর্যন্ত ভারতবর্ষের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্প প্রতিষ্ঠানে বিজ্ঞানী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন, সেকারনেই তাকে বিজ্ঞানীদের বিজ্ঞানী বলা হতো। তাঁর কৃতি ছাত্ররা হলেন, ডাঃ মেঘনাদ সাহা, হেমেন্দ্র কুমার সেন, বিমান বিহাী দে, প্রিয়দা রঞ্জন রায়, জ্ঞানেন্দ্রনাথ রায়, জ্ঞান চন্দ্র ঘোষ, জ্ঞানেন্দ্র নাথ মুখোপাধ্যায়, রাজেন্দ্র লাল দে, প্রফুল্ল কুমার বসু, বীরেশ চন্দ্র গুহ, অসীমা চ্যার্টাজী প্রমুখ। ঢাকা সাধনা ঔষধালয়ের প্রতিষ্ঠাতা ডঃ যোগেশ চন্দ্র ঘোষ, পিসি রায়ের ছাত্র ছিলেন। অসংখ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অসহায় মানুষের চিরন্তর বন্ধু ছিলেন আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়।
পরনে মোটা খোটা ধুতি, গায়ে সাদাসিধা একটি কোট। চুলে বোধকরি চিরুনি পড়েনি। লোকটি কিন্তু গরিব নন কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেরা অধ্যাপক। তৎকালীন মাসিক আয় হাজার টাকার ওপর। সে আয় থেকে ৪০ টাকা রেখে বাকী সব দান করে দেন। একদিন গন্যমান্য লোকদের সঙ্গে আলাপ করছিলেন এমন সময় ছোট্ট একটি ছেলের কাছ থেকে চিঠি পেলেন তার পড়াশুনা চলে না, প্রফুল্ল চন্দ্র রায় তৎক্ষনাৎ পোষ্ট কার্ড লিখে ছেলেটিকে আসতে বলেন। কলিকাতার বিখ্যাত বেঙ্গল কেমিক্যাল তার সৃষ্টি। বেঙ্গল কেমিক্যাল থেকে বছরে লাখ লাখ টাকা আয় হলেও নিজের ভোগের একটি পয়সাও রাখেননি। ইংল্যান্ডে এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বৈজ্ঞানিক গবেষনার জন্য ১৮৮৮ সালে ডক্টর অব সায়েন্স ডিগ্রী অর্জন করেন। রসায়ন তথ্য অনুসন্ধানে মৌলিক গবেষণার বিশিষ্ট প্রতিভাবানদের এই পুরস্কার দেওয়া হয়। ১৮৯৫ সালে তিনি মারকিউরাস নাটট্রিট আবিস্কার করেন। এই আবিস্কারটি তাকে বিপুল খ্যাতে খ্যাতি এনে দেয়।
নিজের রাড়–লী গ্রামে প্রতিষ্ঠা করেন যশোর- খুলনার প্রথম বালিকা বিদ্যালয় ভুবন-মোহিনী বালিকা বিদ্যালয়। পিতার নামে প্রতিষ্ঠা করেন আর,কে,বি,কে, হরিশ্চন্দ্র ইনষ্টিটিউট। দারিদ্র মানুষের অভাব বিমোচনের জন্য ১৯২৩ সালে রাড়–লী সেন্ট্রাল কো-অপারেটিভ ব্যাংক চালু করেন। ১৯৩২ সালে কলিকাতা টাউন হলে প্রফুল্ল রায়ের ৭০ তম জন্ম জয়ন্তী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সভাপতির ভাষণে কবি গুরু বলেন আমরা দুজনে সহযাত্রী, কালের তরীতে আমরা প্রায় এক ঘাটে এসে পৌছেছি। কর্মের ব্রত ও বিধাতা আমাদের কিছু মিল ঘটিয়েছেন। আমি প্রফুল্ল চন্দ্রকে তাঁর সেই আসনে অভিনন্দন জানাই, সে আসনে প্রতিষ্ঠিত হয়ে তিনি তাঁর ছাত্রের চিত্তকে উদ্বোধিত করেছেন, কেবলমাত্র তাকে জ্ঞান দান দেননি, নিজেকে দিয়েছেন, যে দানের প্রভাবে তিনি নিজেকেই পেয়েছেন। এরপর তিনি আচার্যদেবের হাতে একটি তাম্র ফলক উপহার দেন। কবির স্বরচিত দুটি ছত্র তাতে উৎকীণ ছিল-
প্রেম রসায়নে ওগো সর্বজনপ্রিয়
করিলে বিশ্বের জনে আপন আত্মীয়।
আচার্যদেব তাঁর বহু ছাত্রের মধ্যে নিজেকে বিকশিত করতে পেরেছেন, কবিগুরুর উপনিষদের বাণীর পুনরোল্লেখে আমরা সেটা উপলব্ধি করি। বাগেরহাট পিসি কলেজ তার কর্ৃীতি। নিজ জেলা শহর খুলনা অঞ্চলের জন্য তিনি আত্মকর্মসংস্থানের জন্য প্রতিষ্ঠান করেন সমবায় ভিত্তিক প্রফুল্ল চন্দ্র টেকসটাইল মিলসঃ লিঃ।
আন্তজার্তিক খ্যাতি সম্পন্ন মানুষটি আমাদের মাঝ থেকে বিদায় নিয়েছেন ১৯৪৪ সালের ১৬ জুন। তিনি ছিলেন আমাদের জাতীয় জীবনে উজ্জ্বল পুরুষ। তিনি মরেও অমর। আগামী ২ আগষ্ট তাঁর ১৫৭ তম জন্ম বার্ষিকী। তাঁর প্রতি রহিল আমাদের গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলী।

 

(লেখকঃসাংবাদিক। পাইকগাছা প্রতিনিধি )