Friday, 24 Aug 2018 09:08 ঘণ্টা

ভারত সুর পাল্টাচ্ছেঃসহসাই রাজনীতির গুটি পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে

ভারত সুর পাল্টাচ্ছেঃসহসাই রাজনীতির গুটি পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে

রাজনৈতিক ভাষ্যকার । দিল্লি ও ঢাকা । ২৫ আগস্ট । ২০১৮ ।

 

 

বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক সংকট থেকে উত্তরনের জন্য পশ্চিমাদের প্রচন্ড চাপ সরকারের উপর অব্যাহত থাকা অবস্থায় সরকারের সব চাইতে নিকট এবং নানা পরীক্ষায় বিশ্বস্থ বন্ধু ভারত সরকারও সুর পাল্টাচ্ছে ধীরে ধীরে। আগামী জাতীয় সংসদের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন এক মেরুকরণ ঘটতে যাচ্ছে, যাতে সব কটা পশ্চিমাদেশের সাথে শেষ মুহুর্তে ভারত সরকারও থাকার সিগন্যাল দিয়েছে।

পশ্চিমা দেশগুলো চায় ক্ষমতার ভারসাম্য এবং সুশাসন ও জবাবদিহিমূলক এবং অংশগ্রহণমূলক সরকার। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক এবং সকল রাজনৈতিকদলগুলোর অংশগ্রহণের মাধ্যমে হউক, জনগনের ভোট দেয়ার নিশ্চয়তা থাকুক-পশ্চিমা দূতেরা তা নিশ্চিত করার জন্য দৌড় ঝাপ চালাচ্ছেন। ইউরোপিয় ইউনিয়নভুক্ত সব কটা দেশের দূত, মার্কিন সরকার, ব্রিটেন এবং সর্বশেষ প্রতিবেশী এবং প্রভাবশালি দেশ ভারত সরকারও নীতিগতভাবে এই মতে একমত।

 

ভারতের প্রতিবেশী দেশ নেপাল ইতোমধ্যেই ভারত বলয়ের বিরোধী সরকার গঠিত হয়েছে। কাছের দেশ মালয়েশিয়াও ভারতের নাগালের বাইরে চলে গেছে।পাকিস্তান কট্রর ভারত বিরোধী।আফগানিস্তান আরো একধাপ এগিয়ে। মালদ্বীপের মতো দেশও ভারত সরকারের নাকের ডগার বাইরে।শ্রীলংকা আগের মতো আর নেই।চীন ক্রমেই ভারতের জন্য ভীতি ও নাকের উপর তীব্র শংকার কারণ হয়ে আছে। আছে শুধু ভুটান এবং বাংলাদেশ।ভুটানেও পরিবর্তনের হাওয়া বইছে। ভারতের জন্য সব চাইতে কাছের এবং একমাত্র নির্ভরযোগ্য (রাজনীতি, অর্থনীতি,সমরনীতি) হলো বাংলাদেশ।কোন কারণে বাংলাদেশ ভারতের বলয়ের বা নাগালের বাইরে চলে গেলে, তাহবে ভারত সরকারের জন্য বিরাট এক ঝুকি।সেটা অর্থনীতি, ভু-রাজনৈতিক এবং নিজেদের অভ্যন্তরীন শান্তি শৃংখলার জন্য হবে বিরাট হুমকী।ভারত সেই সব সমীকরণ এখন ভালোকরেই জানে এবং করে রেখেছে।সুতরাং ভারত এই মুহুর্তে কোন ঝুকিপূর্ণ চাল খেলবেনা।

 

ক্ষমতাসীন শেখ হাসিনার সাথে ভারত সরকারের দহরম-মহরম যেমন, তেমনি ডঃ কামাল হোসেন, ডঃ মোহাম্মদ ইউনুছ, আ স ম আবদুর রব, মাহমুদুর রহমান মান্না, বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী, সুলতান মনসুর গংদেরও যোগাযোগ এখন আগের যেকোন সময়ের চাইতে বেশী। বিশেষ করে ইইউ এর ২৮টি দেশ আর মার্কিন সরকারের দ্যুতিয়ালিতে সেই মাত্রায় আরো প্রখরতা লাভ করেছে বৈ কমেনি। ক্ষমতাসীন শেখ হাসিনার সরকার পূর্বমুখী কূটনীতি সচল করতে গিয়ে নাটকীয়ভাবে ভারতকে টপকিয়ে চীনের কাছ থেকে  সাবমেরিন কেনাকে নয়াদিল্লির সরকার কোনভাবেই ভালোচোখে দেখেনি।বঙ্গোপসাগরে চীনের সরকারের সহযোগিতায় দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক টার্মিনাল-ভারতীয় বলয়ের জন্য আরো অস্বস্তিকর, যা ভারতের প্রভাবকে খর্ব করবে বঙ্গোপসাগরে। শেখ হাসিনার দুর্বল সরকারের মাধ্যমে ভারত যেভাবে বিগত ৯টি বছর কানায় কানায় সব পুষে নিয়েছে, এমনকি ভারতের বৈদেশিক অর্থনীতির সিংহভাগ যোগানদার এখন বাংলাদেশ, শেখ হাসিনার সরকারের কল্যাণে। এতদসত্যেও ভারত সরকার শেখ হাসিনার সরকারের বিপরীতে ডঃ কামাল বিচৌধুরীর নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্যের নতুন সরকার এলে ভারতের জন্য ঝুকি কিংবা হুমকীর পরিবর্তে বরং নতুন এক অসাম্প্রদায়িক, ভারসাম্যমূলক, অংশগ্রহণমূলক এবং জবাবদিহিমূলক সরকার এর সাথে ব্যবসা, অর্থনীতি, সামরিক, ভু-রাজনৈতিক সম্পর্ক গড়তে ও চালাতে আরো  অধিকতর সহজতর হবে।ডঃ কামাল-বিচৌধুরীর সরকারে কোনভাবেই সাম্প্রদায়িক জঙ্গিগোষ্ঠীদের ঠাই হবেনা-যা ভারতের জন্য কোন মাথা ব্যাথার কারণ হবেনা। শেখ হাসিনা এবং খালেদা জিয়ার সরকারে বরং ভারত যে পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়, জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক বলয়ে ভারত তা থেকে মুক্ত থাকবে। তাছাড়া জাতীয় ঐক্যের সরকারে পশ্চিমা ও ভারতীয় বলয়ের আরো অনেক বিদগ্ধজনের সমাবেশ, ভারত সরকারের জন্য আরো আস্থার পরিবেশ তৈরি করবে।

 

এদিকে বঙ্গোপসাগর, সেন্টমার্টিন আর নিঝুমদ্বীপে মার্কিনীরা একক আধিপত্য বজায় রেখে বাংলাদেশ সরকারের সাথে অংশগ্রহণমূলক বাণিজ্য চায়।আগামীর বাংলাদেশ আর বিশ্ব-বাণিজ্যের নতুন এক প্রাণকেন্দ্র হিসেবে বঙ্গোপসাগর কেন্দ্রিক জ্বালানী তেলের চ্যানেল, নিঝুম দ্বীপে মার্কিনীদের অ্যাটোমিক বিমান রক্ষণাবেক্ষণ কারখানা, আর গভীর সমুদ্র বন্দর টার্মিনালের অংশীদারীত্বের বাণিজ্য লাভে ভারতকে মার্কিনীদের সহায়তা ছাড়া চীনের সাথে পেরে উঠা দুষ্করই নয়, অসম্ভব-যতোই ক্ষমতাসীন সরকারের সাথে সম্পর্ক গভীর হউক না কেন।কেননা শেখ হাসিনার সরকার থ্রি-ডি আদলে মার্কিনীদের সাথে বাংলাদেশ সরকারের চুক্তির স্বাক্ষর করেই আছেন অনেক আগেই।ওবামার সময়ে ভারতকে এতদঅঞ্চলে একচ্ছত্র ক্যাপ্টেন্সির অধিকার অনেকটা অঘোষিতভাবেই পেন্টাগন এবং ওয়াশিংটন দিয়েছিলো। কিন্তু ট্র্যাম্পের আমলে সেই সম্পর্কে ভাটার টান ধরেছে। ট্র্যাম্প ব্যবসায়ী কাম কট্রর জাতীয়তাবাদী নেতা। নরেন্দ্র মোদী যখন ট্রাম্পের সাথে বৈঠক করেন, ট্র্যাম্প মোদীকে ব্যবসায়িক রাজনীতির পার্টনারশিপের সিগন্যাল দিলে ক্ষমতাসীন শেখ হাসিনার সরকারের উপর ভরসা করে সেই সম্পর্কের ভিত গড়তে সচেষ্ট হননি। এদিকে চীনারা ক্ষমতাসীন শেখ হাসিনার সরকারের সাথে বঙ্গোপসাগরের গভীর সমুদ্র বন্দরের কন্ট্রাক্ট সহ সব কিছু ঠিকই ভাগিয়ে নেয়, নরেন্দ্র মোদীকে ঘুমের মধ্যে রেখে। ভারত সরকারের মাথায় এই হিসেবও এখন বড় মাথা ব্যাথার কারণ হয়ে আছে।অপরদিকে সীমান্তে চতুর্দিকে(শুধু মাত্র বাংলাদেশ ছাড়া) ভারতের জন্য চীন, পাকিস্তান, নেপাল, আফগানিস্তান সবই এখন বৈরি ও উত্তপ্ত অবস্থায় আছে।

 

অন্যদিকে কয়লার নির্ভর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে ভারতের ও চীনের পরিবর্তে ঢাকা রাশিয়াকে বেছে নেয়, যদিও রাশার সাথে ভারতের বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে।ভারত সরকার জানে, রাশার মাধ্যমে পারমাণবিক রি-এক্টর ঢাকা ইরান, পাকিস্তান এবং তুরষ্কের মাধ্যমে অদূর ভবিষ্যতে পেতে খুব একটা বেগ পেতে হবেনা, যা হবে ভারত সরকারের জন্য আত্মঘাতি।বন্ধুর বেশে বিপদের অশনি সংকেতের হিসেব নয়াদিল্লি করছে।

 

সাম্প্রতিক কিশোর কিশোরীদের আন্দোলন যেভাবে ঢাকা মোকাবেলা করেছে, পশ্চিমাদের সাথে ভারতও ভালোচোখে দেখেনি। ক্ষমতাসীন সরকার তাদের ৯ বছরের শাসনামলে রাজনীতির চালে সব চাইতে ভুল চালটাই খেলেছে সাম্প্রতিক ছাত্র আন্দোলনে।কিছু একটা যে ঘটে গেছে, সব জায়গায়ই এখন কানাঘুষা হচ্ছে।

 

পশ্চিমাদেশগুলোর সরকার ভারতকে আশ্বস্থ করেছে, ডঃ কামাল-বিচৌধুরীর জাতীয় ঐক্যের সরকারে বৃহত বিরোধীদল বিএনপি থাকবে এবং সেক্ষেত্রে খালেদা জিয়া সময়ের প্রেক্ষিতে সরকারে আসলেও জাতীয় ঐক্যের ফ্রেম ওয়ার্কের ভিতর দিয়েই নিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে আসবেন, দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এবং তারেক রহমান সিন্ডিকেন্ট কোনভাবেই জাতীয় ঐক্যের সরকারের অংশীদার যেমন হবেন না, রাজনীতির লাইম লাইটে না থেকেও আরো কিছুটা সময়(নির্ধারিত ফ্রেম ওয়ার্ক) বাইরে থাকবেন।ফলে ভারত সরকারের জন্য মাথাব্যাথার কোন কারণ থাকছেনা।

 

ক্ষমতাসীন শেখ হাসিনার সরকার বহির্বিশ্বের এমন নাটকীয় পরিবর্তনের ইঙ্গিতে প্রচন্ড চাপ এবং নড়ে চড়ে বসেছেন। শেখ হাসিনার সরকার এখন একদিকে যেমন চাপ সামলাচ্ছেন এককভাবে, তেমনি নতুন কৌশল নিয়ে ব্যস্ত।শেখ হাসিনার সরকার ভারতকে নিজের বলয়ে আশ্বস্থ ও ভাগে রাখার জন্য সকল কৌশলেই খেলেছেন। হাতে রয়ে গেছে এখন দুটি ট্র্যাম্প কার্ড। এর যেকোন একটি সামান্য হেরফের হলেই হীতে বিপরিত হয়ে যাবে, শেখ হাসিনার সরকার সেটা ভালো করেই জানেন। তাই সরকারের উপর প্রচন্ড চাপ থাকা সত্যেও শেখ হাসিনার সরকার ধৈর্যের সাথে আগামী নির্বাচন পর্যন্ত সময় কোনভাবে টেনে নিতে চান।অভ্যন্তরীন প্রেসার মোকাবেলায় তাই কৌশলে আরপিও সংশোধনীর রাজনীতিকে সামনে ঠেলে দিয়েছেন।উদ্দেশ্য এক ঢিলে দুই পাখি মারার।জাতীয় ঐক্যের ফর্মুলা যাতে সফল না হয়, শেখ হাসিনার সরকার থেকে নেতাদের প্রচন্ড চাপ মোকাবেলা করতে হবে। সেই চাপের কাছে জাতীয় ঐক্য প্রচেষ্টার প্রধান দুই নেতা কতোটুকু টিকতে সক্ষম হবেন-সেটা সময়ই বলে দিবে।জাতীয় ঐক্যের অন্যান্য নেতারা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেও প্রধান দুই নেতা সরকারি প্রচন্ড চাপের কাছে খুব একটা টিকে থাকতে পারবেন কিনা সেটাই বড় প্রশ্ন।আওয়ামীলীগের সরকার নিজেদের টিকিয়ে রাখার জন্য হেন কোন চাল নেই যে চালাবেনা-এটা হলফ করে কেউ বলতে পারবেনা।

পাঠক

Flag Counter