আপডেট ২ ঘন্টা আগে ঢাকা, ২৩শে জানুয়ারি, ২০১৯ ইং, ১০ই মাঘ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, ১৬ই জমাদিউল-আউয়াল, ১৪৪০ হিজরী

Breaking News
{"effect":"fade","fontstyle":"normal","autoplay":"true","timer":4000}

প্রচ্ছদ জাতীয়

Share Button

সবার মাঝে লুকিয়ে আছ তুমি..

| ২২:৪৯, অক্টোবর ২০, ২০১৮
ময়নূর রহমান বাবুল
ওয়াটস অ্যাপ কর্ণার থেকে । লন্ডন টাইমস নিউজ-রাস্তার একদিকে কলেজের মাঠ। সবুজ ঘাসের বিস্তৃত এই মাঠ পেরিয়ে সামনে এগুলেই কলেজের সুবিশাল ভবন। তার একপাশে অডিটোরিয়াম, অন্য পাশে অফিস। এই একাডেমিক ভবনের নীচ তলায় বিভিন্ন বিভাগের শ্রেণী কক্ষ। উপর তলায় একপাশে অফিস তার বিপরীতে শিক্ষক  মিলনায়তন। এর ওপাশে অধ্যক্ষের কক্ষ। নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের গণ্ডী পেরিয়ে আসা বীর সাহসী কোন শিক্ষার্থী আর যে কক্ষে নির্ভয়ে যাতায়াত করতে পারলেও এই অধ্যক্ষের কার্যালয় কক্ষে প্রবেশ করতে বুক কাঁপে দশবার। বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে কপালের চকচকা অংশে। চৈত্র মাসের খরায় ফেটে যাওয়া মাঠের মতো গলা শুকিয়ে নিরস হয়। কথা থেকে কাশি আসে বেশী। বাক্য আটকে যায় মুখে। কিন্তু আমাদের সে রকমটা ছিলোনা। না, আমরা যে খুব বীর বা সাহসী ছিলাম তা হয়তো নয়। আমাদের সাহস যোগান দেয়া হয়েছিল। আর এই পথ প্রদর্শক, সাহসের যোগানদাতা, আলোর দিশারী ছিলেন মুলত এই অধ্যক্ষের কক্ষে সোনালী কাঠের আসনটিতে বসা ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ। আমাদের পরম শ্রদ্ধার, আমাদের আদর্শের, আমাদের উদ্দীপনা যোগানোর প্রধান ব্যক্তি। বিড়ালকে সাহস দিয়ে বাঘ বানিয়ে দেবার প্রেরণাদাতা আপন একজন মানুষ – আমার সোনালী দিনের আলোর দিশারী অধ্যাপক মোঃ নুরুল গনী স্যার।
আমাদের সময়ে (১৯৭৯-৮০ শিক্ষাবর্ষে) বেশির ভাগ সময়েই তিনি ছিলেন সরকারী এম সি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ। তিনি বাণিজ্য বিভাগের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য শিক্ষক। তাঁর চেয়েও আকর্ষণীয় বিষয় ছিলো যে, তিনি ছিলেন কলেজ ছাত্রাবাসের তত্ত্বাবধায়ক। একজন শক্ত বরফ পাথরের গড়া সুন্দর মনের মানুষ। শক্ত ঠিকই। কিন্তু গলে গিয়ে তিনি খুব বেশী মিশে যেতেন এবং আপন করে নিতেন শিক্ষার্থীদেরকে আপন সন্তানের মতো।
আমি বাণিজ্য বিভাগের ছাত্র ছিলাম না বলে শিক্ষক হিসাবে তাঁকে সরাসরি পাইনি ঠিকই। কিন্তু দীর্ঘদিন পরে স্থবিরতা কাটিয়ে নির্বাচিত কলেজ ছাত্র সংসদের নির্বাচনে আমাদের প্যানেল সংখ্যা গরিষ্ঠতা পায়। বিজয়ী প্যানেলে ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক (জি এস) হিসাবে তাঁর সান্নিধ্য পেয়েছিলাম অনেক বেশী। বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ছাত্রসংসদের যে সভাগুলো হতো সেখানে তিনি ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসাবে তথা ছাত্রসংসদের সভায় পদাধিকার বলে সভাপতিত্ব করতেন। সম্পাদক হিসাবে সভাগুলো পরিচালনার ভার আমার উপর ন্যস্ত থাকতো। স্যারের কাছে এতো বেশী যাওয়ার প্রয়োজন হতো, ক্লাসেও এতো বেশী যাওয়া হতো কি না মনে পড়েনা। ছাত্রসংসদের সভা আহ্বানের সাথে সাথে মূল কর্মসূচী ছাড়াও আমার মাথায় বাড়তি সবচেয়ে বেশী ঘুরপাক খেত একটি বিষয়। আর তা হলো, বৈঠকে বসেই কিছু সময় যেতে না যেতেই স্যার কিছুক্ষণ এদিক ওদিক তাকিয়েই আমার উপর তাঁর সুতীক্ষ্ণ চোখ রেখে বলতেনঃ মিটিং নট সাকসেসফুল উইদাউট ইটিং। তারপর মুচকি হেসে আমাকে বলতেনঃ পিয়নকে পাঠাও। প্রথম দিনের পরেই আমি আর হোঁচট খাইনি কখনো। স্যারের ঐ ইটিং এর ব্যবস্থা আগেই ছাত্র সংসদের কর্মচারী মঈনুদ্দিনকে দিয়ে ব্যবস্থা করিয়ে রাখতাম। নুরুল গনী স্যার তখন গাম্ভীর্যের মাথা দোলাতেন।
কলেজের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, সাংস্কৃতিক সপ্তাহ, বিতর্ক প্রতিযোগিতা, বার্ষিক মিলাদ, কলেজ বার্ষিকী প্রকাশনা ইত্যকার অনেক বিষয়াদি ছাত্রসংসদের কার্যক্রমের আওতায়ই ছিলো। ছাত্রাবাসের একজন আবাসিক ছাত্র হিসাবে নুরুল গনী স্যারকে সবচেয়ে বেশী কাছে পেয়েছিলাম আমরা। যদিও ছাত্রাবাসের সহযোগী তত্ত্বাবধায়ক হিসাবে বাংলা বিভাগের মনোহর আলী স্যারও ছিলেন আমার অতি কাছের জন। এ কথাটা মোটেও অত্যুক্তি নয় যে, তাঁরা কেবল যেন শিক্ষকই ছিলেন না – পথ প্রদর্শক সহযোদ্ধা বন্ধুর মতো। মনোহর আলী স্যার তাঁর আবাসিক সমস্যার কারনে হোস্টেলে দুটি কক্ষ নিয়ে সপরিবারে আমাদের সাথেই থাকতেন। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সরদার আলা উদ্দিন আল আজাদ নামের আরও একজন স্যার ছাত্রাবাসে আমাদের সাথে থাকতেন, তাঁর আবাসিক সমস্যার কারনে। আর নুরুল গনী স্যার থাকতেন ছাত্রাবাসের পাশেই তত্ত্বাবধায়কের জন্য নির্ধারিত বাসভবনে। এর অদুরেই অধ্যক্ষের বাসভবনটি খালিই পড়েছিলো সে পুরোটা সময় যাবৎ। পরে অবশ্য অধ্যক্ষ মর্তূজা মিঞা নিয়োগ পেলে তা পূর্ণ হয়। যদিও আমরা শিক্ষাবর্ষ শেষ হয়ে যাওয়ায় তাঁকে খুব কমদিনই পেয়েছিলাম।
তত্ত্বাবধায়কের কার্যালয় ছিলো ছাত্রাবাসের সামন দিকেই। পাশে ছাত্রদের খাবারের জন্য বিরাট হল ঘর। আবাসিক কক্ষ কিংবা ডাইনিং হল থেকে বেরিয়েই কখনো স্যারকে তাঁর অফিসে একা বসে থাকতে দেখলেই অকারণেও ঢু মারতাম। কোন না কোন একটা অজুহাত বের করে নিয়ে কথা বলতাম। স্যার খুবই কৌতুক প্রিয় ছিলেন। ছাত্রাবাসের বৈঠকগুলোতেই তা তিনি বেশী প্রকাশ করতেন।
আমাদের এক সহপাঠীর নাম ছিলোঃ ‘নেপা মিয়া’ সতীর্থরা প্রায়ই তাকে ক্ষেপাবার জন্য ঠাট্টা করে বলতেনঃ ভাই নেপা মিয়া, ধরো তুমি লেখাপড়া করে একদিন বড় কিছু একটা হলে। ডি সি কিংবা এস ডিও হলে। তখন লোকে বলবেঃ নেপা মিয়া ডি সির কাছে যাচ্ছি অথবা আমাদের জেলায় ডি সি হচ্ছেন নেপা মিয়া, ইত্যাদি। কেমন অন্যরকম শোনায় না ? এসব শোনতে শোনতে একদিন ভোর বেলা নেপা মিয়া স্যারের বাসার সম্মুখে দাঁড়ানো। পথ আলগে যেন দাঁড়িয়েছে স্যারের। স্যার বিষয় কী তা জানতে চাইলেন। নেপা মিয়া বললেনঃ স্যার আমার  নামটা পরিবর্তন করবো। আপনি ভালো একটা নাম রেখে দিন আমাকে। তখন স্যার আশ্বস্ত করলেনঃ ঠিক আছে, তাই হবে। তবে তুমি কি কিছু মনস্থ করেছ ? উত্তরে নেপা মিয়া তার পছন্দের পরিবর্তিত নামঃ আব্দুল নেপা’ হবে বলে তার মতামত জানান। স্যার তাঁর গাম্ভীর্য বজায় রেখেই নেপাকে আরও ভাববার সময় দিয়ে তাঁর পথ অতিক্রম করেন। এরকম আরও অনেক কৌতুক, যা সত্যি ছিলো, ছিলো আমাদের মধ্যেই, আমাদেরকে নিয়ে ঘটে যাওয়া কোন ঘটনা।
ছাত্রাবাসে আমরা স্বেচ্ছায় বেশ কিছু বই দিয়ে একটা পাঠাগার চালু করেছিলাম। স্যারের কার্যালয়ে সেই বইয়ের সংরক্ষণের অনুমতি তিনি দিয়েছিলেন, সাথে বই রাখার জন্য একটা আলমারিও দিয়েছিলেন। একবার কলেজের কাজেই তিনি ঢাকা গিয়েছিলেন। আসার পথে মৌলভী বাজারের কনকপুরের কাছে কোচ দুর্ঘটনায় বেশ আহত হন। খবরটা শোনার সাথে সাথেই আমি মৌলভীবাজার মহকুমা সদর হাসপাতালে যাই তাঁকে দেখতে। তখনো স্যারের আত্মীয় স্বজন বা কেউই এসে উপস্থিত হননি। আমি একা ফেলে আসিনি সেদিন স্যারকে। সেখানে থাকতে হয়েছিলো আমাকে। কাছে থেকে স্যারের সেবা শশ্রুসা করার সুযোগ পেয়েছিলাম।
১৯৮১ সালে উচ্চমাধ্যমিক শেষে এম সি কলেজ ছেড়ে আসতে হয়। ভর্তি হই সরকারী কলেজে (বর্তমান নামঃ এম সি কলেজ) স্নাতক শ্রেণীতে। এর পরও স্যারের সাথে গোটা কয়েকবার দেখা হয়েছে। স্মৃতি যদি বিরূপ না হয় তবে যতটুকু মনে পড়ে পরবর্তীতে স্যার বদলী হয়ে হবিগঞ্জের বৃন্দাবন কলেজে অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। উল্লেখ্য স্যারের গ্রামের বাড়ী ছিল হবিগঞ্জ এবং চুনারুঘাটে ছিল তাঁর শ্বশুর বাড়ী।
জীবনের এই প্রান্তে পৌঁছে আজও যখন পাশ ফিরে তাকাই, তখন ঝাপসা অন্ধকারকে আলোকিত করে সামনে এসে যে গুণীজন শ্রদ্ধাস্পদ প্রজ্ঞাবান ব্যাক্তিগন বা প্রেরনাদাতা, সাহস বা উতসাহদাতা শিক্ষকগন দাঁড়ান। অর্থাৎ যাঁদের ছায়া দেখতে পাই তাঁদের মধ্যে শ্রদ্ধেয় অধ্যাপক নুরুল গনী স্যার তাঁর আপন মহিমায় জ্বল জ্বল করে ওঠেন। শ্রদ্ধাবনত হই। শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করি স্যারকে। অনেকবারই ভেবেছি স্যার কোথায় আছেন, কোথায় থাকেন এখন ? একবার যেভাবেই হোক দেখা করবো। কিন্তু জীবনের নিষ্ঠুর বাস্তবতায় যা আর হয়ে ওঠেনি। বিশেষ করে প্রবাস জীবনই এর প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়ালো।
স্যারের মৃত্যু সংবাদ আজ খুব জোরে এসে হৃদয়ে যেন ধাক্কা দিলো। নিজের অনেক মূল্যবান কোন সম্পদ যে আজ হারিয়ে গেল। চিরন্তন সত্য মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছেন তিনি। তবে আমার মনে হয় তাঁর কর্মময় জীবনে যত মানুষকে তিনি আলোকিত করেছেন, সবাইকে নিয়ে সবার মাঝেই তিনি তাই বেঁচে থাকবেন, জেগে থাকবেন – আমাদের আগামীর পথকে আলোকিত করবেন। যুগ যুগ ধরে আমাদের প্রেরণার আলোক বর্তিকা হয়ে তিনি আমাদের মধ্যেই বিরাজ করবেন। আমরা তাঁর কাছে পড়েছি হয়তো খুব কম, কিন্তু নিঃসন্দেহে তাঁর কাছে শিখেছি অনেক অনেক বেশী। আজ তাঁর এই মৃত্যু বরনের পর যত রকমের ভালো এবং সুফল আছে তা যেন আমার পরম শ্রদ্ধেয় অধ্যাপক নুরুল গনী স্যারের জন্য বরাদ্ধ হয় –কায়মনোবাক্যে আজ শুধু এ টুকুই প্রার্থনা করি।
(প্রাক্তন ছাত্র ও সাধারণ সম্পাদক, ছাত্রসংসদ,এম সি কলেজ ১৯৭৯-৮০ শিক্ষাবর্ষ)

Comments are closed.







পাঠক

Flag Counter



Developed By : ICT SYLHET

Developer : Ashraful Islam

Developer Email : programmerashraful@gmail.com

Developer Phone : +8801737963893

Developer Skype : ashraful.islam625

error: Content is protected !!