আপডেট ২ ঘন্টা আগে ঢাকা, ২৪শে মার্চ, ২০১৯ ইং, ১০ই চৈত্র, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, ১৫ই রজব, ১৪৪০ হিজরী

Breaking News
{"effect":"fade","fontstyle":"normal","autoplay":"true","timer":4000}

প্রচ্ছদ জাতীয়

Share Button

শহীদ বাবার মেয়েরা বলেছেন বাবার কথা

| ২৩:৫৭, ডিসেম্বর ১০, ২০১৮

সুরঞ্জনা ডেস্ক ।১৪ ডিসেম্বর শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস। শহীদদের স্মরণে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক শহীদ বুদ্ধিজীবী মীর আবদুল কাইয়ূমকে নিয়ে লিখেছেন তার মেয়ে অধ্যাপক ড. মাহবুবা কানিজ কেয়া, শহীদ সলিমউল্লাহকে নিয়ে লিখেছেন তার মেয়ে খালেদা নাসরীন বানু,

শহীদ আজিজুর রহমানকে নিয়ে লিখেছেন তার মেয়ে রিজিয়া রহমান এবং শহীদ ডা. গোলাম কিবরিয়া চৌধুরীকে নিয়ে লিখেছেন তার মেয়ে পারভীন আক্তার চৌধুরী। ছবি তুলেছেন শরিফ মাহমুদ ও মানিক রাইহান বাপ্পী

বাবার ছবির দিকে নির্বাক তাকিয়ে মেয়ে ড. মাহবুবা কানিজ কেয়া

সেই যে গেলেন বাবা আর ফিরে এলেন না : মাহবুবা কানিজ কেয়া

একাত্তরের ২৫ নভেম্বর। এ দিনটি আমার জন্য চরম বেদনা ও পরম গৌরবের। আমার বাবা মীর আবদুল কাইয়ূম এই দিনে শাহাদৎ বরণ করেন। মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস আমরা রাজশাহীতেই ছিলাম।

রাজশাহীতে পাকিস্তানি সেনা প্রবেশ করে একাত্তরের ১৩ এপ্রিল। এর আগেই ২৮ কি ২৯ মার্চ দাদা-দাদি, নানা-নানি পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে গ্রামের বাড়ি আলাইপুর গ্রামে চলে যাই।

পাকিস্তান রেডিওতে প্রচার হয় দেশ শান্ত। যার যার কাজে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ জারি হয়। ইতিমধ্যে শহরে ধরপাকড়, আগুন, গুলি, মর্টার সেলের গর্জন, অগণিত মানুষের বর্বরভাবে হত্যাকাণ্ড চলতেই থাকে।

আমাদের গ্রামের আশপাশে মর্টারের শব্দ শোনা যায়। জীবন বাঁচাতে আমরা গ্রামের আরও ভেতরে চলে যাই। কিন্তু গ্রামে থাকাও দায় হয়ে পড়ে। চারঘাটে হত্যাযজ্ঞ চলে। আমরা জুনের শেষে আবার রাজশাহীতে ফিরে আসি।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ জোহা হল ছিল পাকিস্তানি সেনাদের আবাসস্থল। বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠে কামান, ছাত্রছাত্রীবিহীন ক্যাম্পাস, শিক্ষকদের বেশিরভাগই ক্যাম্পাসের বাসা ছেড়ে চলে গেছেন, যারা আছেন তাদের বেশিরভাগই পাকিস্তানি সেনাদের দালাল। শহরে মালোপাড়ায় শহীদ কামারুজ্জামানের পাশের বাসায় আমরা থাকতাম।

বাসায় এসে দেখি সবকিছু পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। দামি জিনিসপত্র সব লুট হয়েছে। আমরা আর সেই বাসায় ফিরে যাইনি। আমরা ফিরে আসি নানার বাড়ি ঘোড়ামারায়। বাবা প্রতিদিন জীবন হাতে নিয়ে কামানের সামনে দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় যাওয়া আসা করেন।

বাবা মনোবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ছিলেন; তার চেয়ারম্যান মো. মতিউর রহমান ছিলেন অবাঙালি। মায়ের বিভাগের চেয়ারম্যান ও অন্য বিভাগের অবাঙালি, দালাল কিছু বাঙালি শিক্ষক ও আর্মি কর্মকর্তাদের নিয়মিত আড্ডা বসত। বাবা-মা বাসায় ফিরে চুপি চুপি বেতার বাংলা শুনতেন, চরমপত্র শুনতেন।

বাবা বলতেন, ‘দেশ একদিন স্বাধীন হবেই কিন্তু দেখে যেতে পারব কিনা জানি না, দেশ স্বাধীন হলে তুমি ছেলেমেয়েদের মানুষ কর, আমি দেশের কাজে নেমে পড়ব।’ সত্যি বাবা স্বাধীন দেশ দেখে যেতে পারলেন না। দেশের কাজও করা হল না তার। অথচ বাবা ছিলেন অফুরন্ত প্রাণশক্তিসম্পন্ন স্বাধীনচেতা এক ব্যক্তি।

সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, খেলাধুলা সব কিছুর সঙ্গে ছাত্রজীবন থেকেই জড়িত ছিলেন। রাজনীতি ও দেশের প্রতি এক ধরনের মমত্ববোধের তাগিদে সবসময় অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে দেখেছি।

আরও দেখেছি সবার প্রতি সহমর্মিতার হাত বাড়িয়ে দিতে। স্নেহময় বাবা, সবার প্রিয় শিক্ষক, সহকর্মীদের প্রিয়বন্ধু, পাড়া-প্রতিবেশীদের সহযোগী, ছোট-বড় সবার প্রিয় যে কোনো আসরের মধ্যমণি, প্রাণচঞ্চল সদাহাস্যময় এক বিবেকসম্পন্ন মানুষ হিসেবে।

আজও মনে হয় বাবা আমার চুল আঁচড়িয়ে দিচ্ছেন, চুল বেঁধে দিচ্ছেন। বাবাকে নিয়ে তেমন কোনো বড় স্মৃতি নেই। তবে টুকরো টুকরো এরকম কিছু স্মৃতি মনে আছে। আমরা চার ভাইবোন। একাত্তরে বড় ভাইয়ের বয়স ছিল ছয়, আর আমার পাঁচ, ছোট বোনের সাড়ে তিন বছর। বাবা আমাদের ভাইবোনদের অনেক ভালোবাসতেন। আমাদের অনেক যত্ন নিতেন। আমার ছোট ভাইয়ের জন্ম ১৯৭২-এর ২৯ ফেব্রুয়ারি।

আমার ছোট ভাইটি বাবার আদর, স্নেহ, ভালোবাসা পায়নি। বাবাকে হারিয়ে আমরা চার ভাইবোন বাবার আদর্শে বেড়ে উঠেছি মায়ের মমতায়। আজ আমরা সবাই প্রতিষ্ঠিত নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে। এটাই আমাদের পরম পাওয়া, আর আমাদের বাবার আশীর্বাদ।

শৈশবে মানুষের গল্পে শুনেছি বাবা দেশের জন্য অনেক কিছু করে গেছেন, সবাই তাকে সম্মান করেছে কিন্তু ছোট শিশুর মনে দূর থেকে শিশুটাকে দেখি। বাবার হারিয়ে যাওয়া যে ক্ষত সেটা কোনো কিছুতেই পূরণ হয় না।

পাঁচ বছরের একজন শিশুকে যখন বাবার মৃত্যুর এরকম ধাক্কা পেতে হয়, সেই ধাক্কা তার ব্যক্তিত্বে সারা জীবন বয়ে বেড়াতে হয়। আমার নিজ অভিজ্ঞতায় মনে হয়, আমার বাবা দেশের জন্য অনেক কিছু করেছেন কিন্তু আমি তো তার মেয়ে। বাবার স্নেহ থেকে বঞ্চিত হয়েছি। বাবার আদর, ভালোবাসা পাইনি। এ ক্ষতি আমার জীবনে কিছুতেই পূরণ হবে না।

একাত্তরের ২৫ নভেম্বর রাত ৯টা হবে। পাড়ারই একজন পরিচিত অবাঙালি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের তদানীন্তন রেজিস্ট্রার এস স্টেনো আবু তালেব আমাদের বাসায় এলেন।

বাবাকে ডেকে বলল, ‘একজন ক্যাপ্টেন আপনার সঙ্গে একটু কথা বলতে চান।’ একটু পরে সেই স্টেনোই এসে খবর দেন ক্যাপ্টেন তার সঙ্গে কথা বলার জন্য গাড়িতে উঠিয়ে নিয়ে গেছে। তারপর আর বাবা ফিরে আসেননি। সারারাত অপেক্ষা, তারপরও অপেক্ষা। এর বিশ দিন পর দেশ স্বাধীন হল। কিন্তু বাবা আর ফিরে এলেন না।

৩১ ডিসেম্বর রাজশাহীর বোয়ালিয়া ক্লাবের বাঁধের ঠিক নিচেই পদ্মার বালুচরে এক বড় গর্তে আরও অনেকের সঙ্গে দড়িবাঁধা, চোখবাঁধা অবস্থায় বাবার মৃতদেহ পাওয়া যায়।

হেতম খাঁ গোরস্থানে বাবাকে কবর দেয়া হয়। যাদের জন্য বাবাকে হারালাম তারাই আজ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত করছে। এখনও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হয়নি, এ বিচার প্রক্রিয়া শুরু হলেও কত বাধা, কত বিতর্ক যা কেবল লজ্জাজনক নয় ধিক্কারজনকও বটে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী শান্তিকামী স্বাধীন বাংলাদেশের জনগণ তাদের কাছে জবাবদিহি চাইবেন কি?

বাবা সলিমুল্লাহর ছবির সামনে মেয়ে খালেদা নাসরীন বানু

একটি রিকশার পাটাতনে বাবাসহ নয়জনের লাশ : খালেদা নাসরীন বানু

আমি দেখতে দাদির মতো। এজন্য বাবা সলিমউল্লাহ আমাকে সবসময় মা বলে ডাকতেন। বাবা বাইরে থেকে এসে আমাকে হাঁক দিতেন, ‘আমার মা কোথায়?’

শীতের সকালে ঘুম থেকে উঠে স্কুলে যেতে চাইতাম না। মা এটা মানতেন না। কিন্তু বাবা বলতেন, থাক ঘুমুচ্ছে ঘুমোক। বাবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাসে এমএ’র পরীক্ষার্থী ছিলেন। পাশাপাশি ব্যবসাও করতেন।

বাবা পড়ছেন আমি বাবার ঘাড়ের ওপর গিয়ে চুলে বেণী করতাম। নিজের কানের দুল খুলে বাবার কানের ফুটোয় পড়িয়ে দিতাম। বাবা বলতেন, দুষ্টুমি করতে ভালো লাগে? মা কোনো কারণে বকা দিলে বাবার অপেক্ষা করতাম কখন জানাব। সব শুনে মাকে বলতেই খুশি হয়ে যেতাম। বাবার কাছেই ছিল আমার যত আবদার।

বাবা শুধু আমাদের ভাইবোনদেরই নয়, মানুষের জন্যও করতেন। কাছের, দূরের আত্মীয়স্বজনদের আমাদের বাড়িতে রেখে পড়াশোনার সুযোগ করে দিয়েছেন।

একাত্তরের ২৩ মার্চ স্বাধীন বাংলার পতাকা উড়ানো হয়। অবাঙালি অধ্যুষিত ঢাকার মোহাম্মদপুরে কেবলমাত্র আমাদের তাজমহল রোডের চারতলা বাড়িতে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উড়েছিল। আমার সেজ ভাই সাদী মোহাম্মদ তকিউল্লাহর আঁকা বাংলাদেশের পতাকা সেলাই করেছিলেন মা জেবুনন্নেসা বেগম।

শুধু তাই নয় বাবা মোহাম্মদপুর এলাকার বাঙালিদের জন্য অনেক জনহিতকর কাজ করেন। তিনি মোহাম্মদপুর স্কুলে বাংলা মিডিয়াম চালু করেন। এসব কারণে তার প্রতি অবাঙালিদের মনে ধীরে ধীরে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।

এরপর ২৫ মার্চ সন্ধ্যায় ছাত্রলীগের নেতারা আমাদের বাড়িতে অবাঙালিদের সঙ্গে বৈঠক করেন স্বাধীনতার পক্ষে কাজ করার জন্য। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অপারেশন সার্চলাইট শুরু হতেই অবাঙালিরা রণমূর্তি ধারণ করে।

২৫ মার্চ অবাঙালিরা আমাদের বাধ্য করে বাড়ি থেকে স্বাধীন বাংলার পতাকা নামাতে। ২৬ মার্চ দুপুরে জুমার নামাজ আদায় করতে বাবা আমাদের বাড়ির উল্টোদিকের মসজিদে যান।

অবাঙালি মুসল্লিরাও একই মসজিদে বাঙালি মুসলমানদের সঙ্গে নামাজ আদায় করেন। কিন্তু অবাঙালি মুসল্লিরা আগে থেকেই মসজিদে অস্ত্র, ছুরি, তরবারি ইত্যাদি নিয়ে গিয়েছিল।

বাবা মসজিদে অবস্থানকালে গুলির শব্দ শোনামাত্র দৌড়ে বাড়িতে চলে আসেন। মুহূর্তের মধ্যে চারদিকে গোলাগুলি শুরু হয়ে যায়। অবাঙালিরা আমাদের বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। পুরো বাড়িতে আগুন জ্বলছে। ভয়ে আমরা চারতলায় উঠে যাই।

আমাদের পিছু পিছু অবাঙালিরাও সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে আসে। ওরা আমার বাবা ও বড় ভাই শাহজাহান মোহাম্মদ শানুকে খুঁজতে থাকে। বিপদ টের পেয়ে বাবা-আর বড় ভাই উপর থেকে লাফ দিয়ে পাশের বাড়িতে পড়েন।

অবাঙালিদের ভয়ে মা দোতলা থেকে লাফ দেন। এত উপর থেকে লাফ দেয়ায় মায়ের দু’পা ভেঙে যায়। আমরা যারা ছোট ছিলাম, তাদের বড়দের কোলে কোলে নামিয়ে আনা হয়।

বাবা-মা, সেজ ভাই সাদী মোহাম্মদ তকিউল্লাহ, চতুর্থ ভাই শিবলী মোহাম্মদ এনামউল্লাহ, ছোট ভাইবোন ও আমি জীবন বাঁচাতে পাশের বাড়ির বাথরুমে গিয়ে লুকাই।

ওই বাড়িতে মহল্লার শত শত বাঙালি আশ্রয় নিয়েছিলেন। অবাঙালিরা বাথরুমে ঢুকে বাবার পিঠে ছুরি দিয়ে আক্রমণ করে। ওদের হাত থেকে বাঁচার জন্য বাবা দৌড়ে রাস্তায় বেরিয়ে এসেছিলেন।

কিন্তু তাতেও শেষ রক্ষা হয়নি। বাবা গলির মোড়ে রেশনের দোকানের সামনে এগুতেই অবাঙালিরা তাকে ছুরিকাঘাত করতে থাকে। রড দিয়ে গলায় আঘাত করে। দূরসম্পর্কীয় চাচা সুরুজ মিয়ার পেটে বল্লম ঢুকিয়ে হত্যা করে।

বড় ভাইয়ের বন্ধু পাশের বাড়ির চিনু ভাইকে হত্যা করে। আনোয়ার নামে এক যুবককে জবাই করে গলায় দড়ি পেঁচিয়ে মোটরসাইকেলে বেঁধে মোহাম্মদপুর এলাকা ঘুরে বেড়ায় অবাঙালি রাজাকাররা। মেয়েরাও সেদিন ওদের নিশংসতার হাত থেকে বাঁচতে পারেনি। একজন নারীকে হত্যা করে তার মাথার চুল দোতলার বারান্দার ফ্যানের হুকের সঙ্গে বেঁধে ঝুলিয়ে রেখেছিল।

অবাঙালিরা ওই বাড়িতেও আগুন ধরিয়ে দেয়। যারা ওই বাড়িটাকে নিরাপদ ভেবে আশ্রয় নিয়েছিলেন তাদের মধ্যে কয়েকজন আগুনে পুড়ে মারা যান।

বড় ভাই, মেজ ভাই শামীম মোহাম্মদ রকিউল্লাহ কোথায় চলে গেছেন আমরা জানি না। ইকবাল ও আজিজ নামে দু’জন অবাঙালি ওই বাড়িতে লুটতরাজ করতে এসেছিল। কোনো কারণে ওদের আমাদের দেখে হয়তো মায়া হয়েছিল।

ওরা দয়া করে আমাদের আট ভাইবোন শোয়েব মোহাম্মদ তরিকউল্লাহ, সোহেল মোহাম্মদ আকরামউল্লাহ, শিবলী মোহাম্মদ এনামউল্লাহ, মালেকা পারভীন বানু, দুই যমজ বোন ফরিদা ইয়াসমিন বানু, লায়লা নাজনীন বানুসহ আমাকে আর আমার অসুস্থ মাকে সন্ধ্যায় ওদের বাড়িতে নিয়ে যায়।

রাস্তায় বেরুতেই দেখি বাবার মৃতদেহ রেশনের দোকানের সামনে পড়ে আছে। বাবার কাছে যেতে চাইলে অবাঙালিরা বাধা দেয়। একটা ঘরে সবাই সারারাত নির্ঘুম কাটালাম।

অবাঙালিরা এলোপাথাড়ি গুলি ছুঁড়ছে। ওই রাতেই মোহাম্মদপুর জামে মসজিদের ইমাম সাহেব দেখেন অবাঙালিরা একটি রিকশার পাটাতনে বাবাসহ নয়জনের লাশ মোহাম্মদপুরের তাজমহল রোডের কবরস্থানে নিয়ে গেছে।

সেখানে একটি বড় গর্ত ছিল। ওই গর্তের মধ্যে অবাঙালিরা আমার বাবাসহ নয়জনের লাশ ফেলে মাটি চাপা দিচ্ছে।

তিনি বাবার খুব ভালো বন্ধু ছিলেন। তিনি বাবার লাশ দেখার জন্য অনুরোধের স্বরে বলেছিলেন, ‘সলিমউল্লাহ সাহেবের লাশটা একটু দেখতে চাই।’ তার কথায় অবাঙালিরা বাবার লাশটা তাকে দেখায়।

ইমাম সাহেব বাবার লাশ শণাক্ত করেছিলেন। মাই আমাদের বাবার মতো আগলে রেখেছেন। বাবার ছবিটা ছাড়া কোনো স্মৃতিই আমাদের নেই। ঘরের সবকিছু পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল।

বাবাকে ধরে পাকিস্তানি সেনারা জল্লাদখানার দিকে নিয়ে যায় : পারভীন আক্তার চৌধুরী

একাত্তরে আমি ছোট ছিলাম। বাবা ডা. গোলাম কিবরিয়া চৌধুরী ছিলেন হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক। মার্চের প্রথম থেকেই ঢাকার মিরপুরের ১১নং সেকশনে অবাঙালিদের দৌরাত্ম্য বাড়তে থাকে।

এখানে বাঙালি পরিবারের সংখ্যা ছিল হাতেগোনা। তাদের মধ্যে অনেকেই মাকে বলতেন, ‘আমার বড় ছেলে আসছে না। অনেকদিন ধরে ও নিখোঁজ।’ আরেকজন বলতেন, ‘আমার অমুক ছেলে নিখোঁজ।’ অবাঙালিরা বাঙালি ছেলেদের গুম করছিল। ধরে নিয়ে মেরে ফেলছিল। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী রাইফেল তাক করে গাড়ির বহর নিয়ে যাতায়াত করত।

এটা দেখে বাঙালিরা বাইরে বের হতো না। ঘরে দরজা বন্ধ করে আলো নিভিয়ে থাকত। আমাদের বাড়িটি ছিল রাস্তার পাশেই। আমরা আলো নিভিয়ে পাকিস্তানি সেনা আর অবাঙালিদের ভয়ে আতঙ্কের মধ্যে থাকতাম। আমাদের ছোটদের খাটের নিচে শুইয়ে রাখা হতো।

আর বড়রা ঘরের মধ্যে অন্ধকারে বসে আল্লাহকে স্মরণ করতেন। চারদিক থেকে কখনও প্রচণ্ড গোলাগুলির আওয়াজ শুনতে পেতাম। আবার কখনও থেমে থেমে গুলির আওয়াজ ভেসে আসত। মার্চ জুড়ে এরকমই চলছিল।

আমরা দশ ভাইবোন। সবার বড় বোন হাসিনা চৌধুরী, এরপর ভাই ফিরোজ খান নুন চৌধুরী, আব্দুল্লাহ আল চৌধুরী, কামাল চৌধুরী, আব্দুল হাই চৌধুরী, গুলজার হোসেন চৌধুরী, হেলেন আক্তার চৌধুরী, সেলিনা আক্তার চৌধুরী এরপর আমি। সবার ছোট বোন নাসরীন আক্তার চৌধুরী। কিছু একটা ঘটতে পারে এই ভয়ে আমার পাঁচ ভাইকে মা জহুরা খাতুন আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। ওরা মগবাজার, নওয়াবপুর খালা-চাচাদের বাড়িতে লুকিয়েছিলেন।

ভাইয়েরা মাঝে মাঝে বাসায় এলে মা ওদের ঘটনাটা বলতেন। ভাইয়েরা প্রথমে বিশ্বাস করেননি।

মা বলতেন, ‘হ্যাঁ এখানে এমন হচ্ছে।’ মাঝে মাঝে অবাঙালিরা বাড়িতে এসে মাকে জিজ্ঞেস করত, ‘তোমার ছেলেরা কোথায় আছে? কি করছে? দেখি না কেন? আসলে দেখা করতে বলবা।’ আমাদের বাড়ির ওপর ওরা কড়া নজর রেখেছিল। মার্চের শেষ দিকে এসে মা সিদ্ধান্ত নিলেন এখানে আর থাকা যাবে না।

এখান থেকে কৌশলে পালাতে হবে। প্রকাশ্যে ওদের সামনে দিয়ে যাওয়া যাবে না। কিন্তু মা বুঝতে পারছিলেন না কখন যাবেন। সকাল, দুপুর না রাতে। কোন সময়টা ভালো হবে এখান থেকে চলে যাওয়ার জন্য। সুযোগ খুঁজছিলেন। অবশেষে ২৩ মার্চ সন্ধ্যায় মা আমাদের ভাইবোনদের নিয়ে ঘর থেকে বের হলেন। আমরা এক কাপড়ে বের হলাম।

এমনকি পায়ে জুতা পরিনি। ঘরের দরজা-জানালা খোলা। যেন অবাঙালিরা বুঝতে না পারে আমরা বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র চলে যাচ্ছি। মিরপুরের রাস্তার কয়েকটি স্থানে অবাঙালিরা আমাদের বেবি ট্যাক্সি থামায়।

আমার বড় বোন অবাঙালিদের সঙ্গে উর্দুতে কথা বললেন। মা সারা রাস্তায় দোয়া পড়ছিলেন। যাতে নিরাপদে নানা বাড়ি ভোলায় পৌঁছতে পারেন। এদিকে স্থানীয় অবাঙালিরা ঘরে আমাদের না পেয়ে জিনিসপত্র লুট করে আগুন ধরিয়ে দেয়।

বাবা আমাদের সঙ্গে গেলেন না। তার ফার্মেসি ছিল এখানে। তিনি হাত-পা ভাঙাচোরা ঠিক করে দিতে পারতেন। বাবা আহত বাঙালিদের লুকিয়ে লুকিয়ে চিকিৎসাসেবা দিতেন।

মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। বাবা আমাদের দেখতে নানাবাড়ি ভোলায় যান। মা কোনোভাবেই বাবাকে আটকে রাখতে পারলেন না। বাবার একটাই কথা মুক্তিযুদ্ধে অনেক মানুষ আহত হয়েছেন। চিকিৎসাসেবা দিয়ে তাদের সুস্থ করে তুলতে হবে। বাবা মামাতো ভাইবোনদের এক টাকা, দু টাকা করে দিলেন।

আমি উঠানে বসে মাটির হাঁড়ি-পাতিল দিয়ে খেলছিলাম। বাবা আমাকে টাকা না দিয়ে সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে যাচ্ছিলেন। আমি দৌড়ে গিয়ে বাবাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদলাম। আমাকে কাছে টেনে বাবা বুকে জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘কি হয়েছে মা?’ আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। চোখ মুছে দিলেন।

আমি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বাবাকে বললাম, ‘সবাইকে টাকা দিয়েছেন আমাকে দেবেন না?’ বাবা পকেট হাতড়ে আমাকে একটি আট আনার কয়েন বের করে হাতে দিলেন। আট আনার কয়েন দেখে বাবাকে বললাম, সবাইকে এক টাকা দিয়েছেন, আমাকে আটআনা দিলেন। বাবা আমাকে আদর করে বললেন, ‘এখন আটআনা নাও।

আমি ফিরে এসে তোমাকে এক টাকা দেব’। বাবার সঙ্গে এটাই ছিল আমার শেষ দেখা, শেষ কথা। বাবা মায়ের বারণ শুনলেন না। সবাই কান্নাকাটি করে বাবাকে বিদায় দিলাম। বাবা ঢাকায় ফিরে এলেন।

ঢাকায় ফিরে বাবা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। মিরপুরের জল্লাদখানার পেছনে বিশাল একটা জলাভূমি ছিল। ধান ক্ষেত ছিল। বাবার সঙ্গে মেজ ভাই আব্দুল্লাহ আল চৌধুরী অপারেশনগুলোতে অংশ নিতেন।

মিরপুরের ১০ নম্বর থেকে বিচ্ছিন্নভাবে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী, স্থানীয় অবাঙালিরা গোলাগুলি করতে থাকে। তাদের গুলির জবাব দিচ্ছিলেন মুক্তিযোদ্ধারা। বাবা আর মেজ ভাইও তাদের সঙ্গে ছিলেন। পাকিস্তানি সেনাদের তুলনায় মুক্তিযোদ্ধারা সংখ্যায় কম ছিলেন। মেজ ভাই গুলি ভরে দিতেন। বাবা গুলি করতেন।

এভাবে পাকিস্তানি সেনা ও অবাঙালিদের গুলি করতে করতে মুক্তিযোদ্ধাদের গুলি শেষ হয়ে যায়। হানাদাররা বুঝতে পারে মুক্তিযোদ্ধাদের গুলি শেষ হয়ে গেছে। তারা সামনে এগুতে থাকে। পাকিস্তানি সেনাদের এগুতে দেখে বাবা মেজ ভাইকে বলেন, ‘তুই দৌড়ে পালা’। মেজ ভাই বলেছিলেন, ‘আপনি’।

মেজ ভাই দৌড়ে সেই স্থান ত্যাগ করেন। অন্য মুক্তিযোদ্ধারাও পিছু হটেন। ওই সময়ে পাকিস্তানি সেনারা বাবাকে ঘিরে ফেলে। বাবার হাত-পা, চোখ বেঁধে ফেলে।

দূর থেকে যারা বাবাকে ধরে নিয়ে যেতে দেখেছেন তাদের কাছ থেকে জানতে পেরেছি। তারা বলেছেন, ‘বাবাকে ধরে পাকিস্তানি সেনারা জল্লাদখানার দিকে নিয়ে যায়।

আরও অনেককে ধরে নিয়ে এসে এখানে নির্মমভাবে হত্যা করেছে।’ ঢাকায় ফিরে বাবার অনেক খোঁজ খবর করেছি। কিন্তু তার লাশ খুঁজে পাইনি। দেশ স্বাধীন হল মিরপুরের ১১ নং সেকশনে ফেলে যাওয়া বাড়িতে আর ঢুকতে পারিনি। বাড়ি দখল হয়ে গেছে।

বাবার আজিজুর রহমানের ছবি হাতে মেয়ে রিজিয়া রহমান

’৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের কাণ্ড কারখানা আজও দেখছি : রিজিয়া রহমান

বাবা আজিজুর রহমান সংস্কৃতিমনা ব্যক্তি ছিলেন। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে ঘোড়াশাল ন্যাশনাল জুট মিলের প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ছিলেন দিনাজপুর সমিতির সাধারণ সম্পাদক।

মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে বাবা মুক্তিযোদ্ধাদের খাওয়া, কাপড়চোপড়ের ব্যবস্থা করতেন। এভাবে ডিসেম্বর চলে আসে। পহেলা ডিসেম্বর ভোর সাড়ে পাঁচটায় পাকিস্তানি সেনারা ঘোড়াশাল জুট মিলে আক্রমণ চালায়। মিল ব্যারাকে আগুন দেয়। গোলাগুলি করে।

মিলের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ধরে নিয়ে শীতলক্ষ্যা নদীর পাড়ে লাইন করে দাঁড় করিয়ে ব্রাশ ফায়ার করে। তাদের মধ্যে কয়েকজন বেঁচে যান। মিলের অন্য কর্মকর্তা-কর্মচারীরা যারা সপরিবারে পালাতে পেরেছিলেন তারা আমাদের বাসায় চলে আসেন। ড্রইংরুমে বাবা তাদের চাদর বিছিয়ে বসতে দেন।

তাদের দোয়া-দরুদ পড়তে বলেন। বাবাকে ঘিরে আমরা পাঁচ ভাইবোন বসেছিলাম। ছোট বোন বাবার কোলে বসে কিছু বুঝতে না পেরে ফ্যালফ্যাল করে সবার দিকে তাকিয়েছিল।

আসরের নামাজের পরে দশ-বারো জন পাকিস্তানি সেনা আমাদের বাসার দরজায় জোরে লাথি মারে। সিটকানি ভেঙে ওরা ঘরের ভেতর ঢুকে কর্কশ কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে ‘আজিজ সাহাব কৌন হ্যায়’।

পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে রাজাকাররাও ছিল। দুজন রাজাকার এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করে ‘এখানে আজিজ সাহেব কে?’ বাবা দ্রুত দাঁড়িয়ে বলেন, ‘আমিই আজিজুর রহমান’। বাবা পরিচয় দিতেই পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তা বলে, ‘তুম মুক্তি হ্যায়, চলো মেরা সাথ।’ আমি বাবাকে জড়িয়ে ধরি। বাবাকে যেতে বারণ করি।

বাবা ঘর থেকে বের হওয়ার সময় হাত তুলে ধীর স্থিরভাবে মা রওশন আজিজকে বললেন, ‘দোয়া পড় আমি আসছি। তুমি ওদের দেখ’।

বাবা, ছোট ভাই, চাচাত ভাইসহ ঘরে পুরুষ যারা ছিলেন তাদের সবাইকে ধরে নিয়ে যায়। পথে চাচাত ভাইয়া পাকিস্তানি সেনা, রাজাকারদের হাত-পা ধরে ছোট ভাই চপলকে ফেরত আনেন।

কিন্তু বাকি সবাইকে ধরে নিয়ে যায়। বাবা তাদের বলেছিলেন, ‘আমরা তো মুসলমান। কোরআন শরিফের যেই সূরা বলতে বলবেন আমি বলব।’ বাবার কথা শুনে পাকিস্তানি সেনারা ক্ষিপ্ত হয়ে একটা ইট বাবার মাথার উপরে তুলে বলেছিল, ‘শুয়োরকা বাচ্চা, বাঙালিকা মুসলমান হায় দৌড়ো’।

এরপরই ওরা ধরে নিয়ে যাওয়া মানুষদের ওপর এলোপাতাড়ি গুলি চালায়। বাবার সঙ্গে ধরে নিয়ে যাওয়া সাতজনের মধ্যে একজন বাবুর্চি ছিলেন। তার পেটে গুলি লাগে। কিছুক্ষণ পর তিনি পেট চেপে ধরে আমাদের বাসায় আসেন। কাঁদতে কাঁদতে মাকে বলেন, ‘ভাবী সবশেষ হয়ে গেছে, স্যার নাই’।

তিনি গুলি খেয়ে মাটিতে পড়েছিলেন। তার কাছেই জানতে পেরেছিলাম, বাবার বাঁ হাতে প্রথম গুলি লাগে। বাবা মাথা উঁচু করে সিকিউরিটি গার্ডকে বলেছিলেন, ‘তুমি এতগুলো মানুষকে মারালে?’ এ কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে পাকিস্তানি হায়েনাররা বাবার বুকে গুলি করে। বাবা মুখ থুবড়ে মাটিতে পড়ে যান। ওই চাচা পেট চেপে বাবাকে স্যার স্যার বলে ডাকেন।

কিন্তু কোনো সাড়া মেলে না। আশপাশে যারা পড়েছিলেন তাদের সবাইকে ডাকেন। কিন্তু কোনো সাড়া মেলেনি। বুঝতে পারেন সব শেষ হয়ে গেছে। বাবা-মায়ের প্রথম সন্তান আমি। বাবার মৃত্যু সংবাদ শুনে নির্বাক হয়ে গিয়েছিলাম। মায়ের বুকফাটা কান্নায় সম্বিত ফিরে পাই। ছোট চার ভাইবোন-মাকে কিভাবে সামলাব বুঝে উঠতে পারছিলাম না।

এমন সময় মিলের একজন কর্মচারী দৌড়ে এসে বললেন মা-বোনদের ওপর পাকিস্তানি সেনারা অত্যাচার করছে। শিশুদের মেরে ফেলবে। মা পাগলের মতো কাঁদছে। ওদিকে বাবার রক্তাক্ত লাশ ঘাসের ওপর পড়ে রয়েছে। পরিস্থিতি দেখে চাচাতো ভাই মাকে বললেন, ‘চাচি চাচাকে হারিয়েছি। এখানে থাকলে এবার আমরাও মরব।’

বাবার অচেতন দেহটা ওভাবে ফেলে জীবন বাঁচাতে সবাই যেদিকে ছুটছে তাদের সঙ্গে আমরাও ছুটলাম। সারা রাত অন্ধকারের মধ্যে মিলের মানুষদের পেছনে পেছনে হাঁটছি। কোথায় যাব কোনো গন্তব্য জানা নেই।

ভোরের দিকে ‘বাগুন’ নামে এক গ্রামে এসে পৌঁছলাম। ওই গ্রামের এক বুড়িমার ঘরে তিন পরিবারের দশ-বারো জন আশ্রয় নিলাম। গ্রামের লোকেরা আন্তরিকতার সঙ্গে আমাদের গ্রহণ করলেন।

২ ডিসেম্বর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আজিজ চাচা ও মিলের দারোয়ান জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাবাসহ দুজন শহীদকে মিলের কোয়ার্টারের সামনে একটি গর্তে মাটি চাপা দেন। দেশ স্বাধীন হল।

আমরা কোয়ার্টারে ফিরে এলাম। মিল কর্তৃপক্ষ, স্থানীয় জনগণ ও মুক্তিযোদ্ধারা সম্মিলিতভাবে বাবাসহ অন্য শহীদদের লাশ তুলে আবার মর্যাদাসহ মিলের দেয়ালের পাশে সমাহিত করেন। এখানে একটি গণকবরসহ মোট দশজন শহীদের কবর রয়েছে।

দেশ স্বাধীন হল। বাবাকে হারালাম। শুরু হল মায়ের আরেক যুদ্ধ। মায়ের মামাতো ভাই লাল মামার বদৌলতে মায়ের চাকরি হল ধানমন্ডি ৩নং রোডের ‘নারী পুনর্বাসন ও কল্যাণ ফাউন্ডেশনে’।

ঘোড়াশাল জুট মিলের কোয়ার্টার থেকে এলাম ঢাকার হাতিরপুলের ভূতের গলির ছোট্ট ভাড়া বাসায়। মায়ের স্বল্প বেতনে আমাদের পাঁচজনের পড়াশোনার খরচ, বাসাভাড়া, খাওয়া-দাওয়ার খরচ চলত।

মা নিজে না খেয়ে আমাদের খাওয়াতেন। অনেক কষ্ট করে খেয়ে না খেয়ে মা আমাদের বড় করে তুলেছেন। মানুষ করেছেন। অথচ আমরা শহীদের সন্তানরা স্বজন হারানোর যন্ত্রণা নিয়ে যুদ্ধাপরাধীদের কাণ্ড কারখানা আজও দেখছি। একেক সময় মনে হয় আমাদের শহীদ পিতারা কি এজন্য জীবন দিয়েছিলেন? জাতির কাছে এটাই আমাদের প্রশ্ন?

Comments are closed.







পাঠক

Flag Counter



Developed By : ICT SYLHET

Developer : Ashraful Islam

Developer Email : programmerashraful@gmail.com

Developer Phone : +8801737963893

Developer Skype : ashraful.islam625

error: Content is protected !!