আপডেট ২২ ঘন্টা আগে ঢাকা, ১৯শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ইং, ৭ই ফাল্গুন, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, ১৩ই জমাদিউস-সানি, ১৪৪০ হিজরী

Breaking News
{"effect":"fade","fontstyle":"normal","autoplay":"true","timer":4000}

প্রচ্ছদ গণমাধ্যম

Share Button

আল আকসা,মক্কা,মদীনা ঘুরে এসে বিদায় নিলেন প্রিয় কয়সর ভাই

| ০০:৪১, জানুয়ারি ১৮, ২০১৯

সৈয়দ শাহ সেলিম আহমেদ । লন্ডন টাইমস নিউজ ।মূল । চ্যানেল এইট । ১৭ জানুয়ারি । ২০১৯।

 

মাহমুদুল হক সৈয়দ কয়সর-যিনি সবার কাছে কয়সর সৈয়দ নামেই সমধিক পরিচিত।আমি তখন বেতার বাংলার নিউজ এডিটর এবং ষ্টেশন ইন চার্জ। বেতার বাংলার সিইও নাজিম চৌধুরী লন্ডনের বাইরে। ছিম ছাম পরিপাটি এবং বেশ বয়স্ক অথচ চির যৌবনে ভরপুর বেতার বাংলায় এলেন। সঙ্গে নিয়ে এলেন ক্রসন্ট ও স্যান্ড উইচ।বললেন হালাল। পরিচয় দিয়ে বললেন আমি মুক্তিযোদ্ধা কয়সর সৈয়দ। নাজিম নানা আমার পরিচিত। ফোনে আলাপ হয়েছে। আমার প্রোগ্রাম এর ব্যাপারে নানা বলেছেন, আপনার সাথে কথা বলতে। আমি বললাম, আপনি একেতো মুক্তিযোদ্ধা-আমার পরম শ্রদ্ধেয় এবং গর্বের, অন্যদিকে অত্যন্ত বয়স্ক মুরুব্বী, আপনি বরং আমাকে তুমি বলেই সম্বোধন করেন। কয়সর ভাই খুব খুশী হলেন। আলোচনার পর নাম ঠিক হলো গৌরবের মুক্তিযুদ্ধ। মঙ্গলবার প্রতি সপ্তাহে বেলা ২টা থেকে ৩টা অবধি বা বিবিসির সংবাদের আগ পর্যন্ত চলবে লাইভ।আমার ইঞ্জিনিয়ার শিপলু  তখনো গড়রাজি। এভাবেই আমাদের সকলের প্রিয় কয়সর ভাইয়ের সাথে সামনে এগিয়ে চলা।

Image may contain: 2 people, indoor

উনি যখন দেশে যেতেন, তখনও আমার উপরই দায়িত্ব অর্পিত হতো উনার প্রোগ্রাম চালিয়ে যেতে। কয়সর ভাই খুব দায়িত্বপ্রবণ ছিলেন, উনার প্রোগ্রাম বন্ধ থাকুক সেটা চাইতেননা। তার পরিবর্তে অন্য কাউকেও দিয়ে যেতে চাইতেননা।আমি বলতাম, আমাকে কেন ট্রাস্ট করেন? কয়সর ভাই বলতেন, তোমার এই কথার মধ্যেই আমার ট্রাস্ট, আমার ভরসা।

 

কয়সর ভাই আমাকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক এর সাথে। তখনকার সময়ে অনেক বাধা বিপত্তি সত্যেও, এমনকি উনার নিজের সার্কেলের বাধার পরেও,আমার চ্যানেল আই এক্সক্লূসিভে  মোজাম্মেল হক এবং কয়সর সৈয়দকে নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লাইভ অনুষ্ঠান করেছিলাম। যদিও পরবর্তীতে মন্ত্রীকে নিয়ে সৈয়দ সাজিদুর রহমান ফারুক আমার চ্যানেল আই এক্সক্লুসিভে লাইভে এসেছিলেন।

Image may contain: 1 person, standing

কয়সর ভাই যখনই আসতেন, অত্যন্ত গোপণে চুপিসারে যত্নের সাথে এসে আমার টেবিলের ড্রয়ারে কোন না কোন খাবার রেখে যেতেন। মানা করলে খুব কষ্ট পেতেন। একদিন কেধেও ফেললেন। আমাকে বলতেন, আমি তোমাকে মুহিত সাহেবের জন্য মায়া করিনা, বরং আমার একজন ছোট ভাই হিসেবে স্নেহ করি। তোমার লেখা, তোমার মতামত, তোমার ম্যাসেজের পাওয়ারকে শ্রদ্ধা করি। আমার ভালোবাসা সেখানেই।

 

বিজয়ফুল নিয়ে আমার চ্যানেল আইয়ের এক্সক্লূসিভের লাইভে সামান্য ভুল বুঝাবুঝির হেতু আমাকে আল আকসাতে বলেছেন। বলেছেন উনি চাপে ছিলেন। আমি তখন শুনতে না চাইলেও উনি আমাকে শুনতে বাধ্য করেছেন।

Image may contain: 2 people, including সেলিমের খবর, people smiling, sunglasses, sky, outdoor and close-up

০২) বিলেতের আরেক প্রথিতযশা খ্যাতিমান সাংবাদিক, কমিউনিটি ব্যক্তিত্ব, ক্যাম্পেইনর ও মুরুব্বী কে এম আবু তাহের চৌধুরী ভাইয়ের অক্লান্ত পরিশ্রম আর সহযোগিতায় এবার মসজিদে আল আকসা, নবী রাসূলদের রওজা জেয়ারত, প্যালেস্টাইন, মক্কা মদীনা জেয়ারত ও উমরাহ সফর সম্ভব হলো। এর কৃতিত্বের দায়ভার সব টুকুই তাহের ভাইয়ের-অবলীলায় স্বীকার করছি।কৃতজ্ঞতাও সেজন্য। কেননা আমি একেবারে অপ্রস্তুত, তাহের ভাই নিজ আমাকে নিয়ে গেলেন-এটাও আল্লাহ পাকের এক রহমত। হিথরো এয়ারপোর্টে গিয়ে কয়সর ভাইকে দেখে ভাবলাম তিনি হয়তো অন্য কোথাও হলিডে যাচ্ছেন। কারণ বেতার বাংলা ছাড়ার পরে দীর্ঘদিন কয়সর ভাইয়ের সাথে যোগাযোগ ছিলোনা। বললেন চারবার উনার স্ট্রোক করেছে। তারপরেও উনি হলিসিটি সফরে যাচ্ছেন। এবং এটাও বললেন, আমাকে দেখে উনার শরীরে প্রাণ ফিরে এসেছে। আমি আল্লাহর শোকর আদায় করে বললাম, হুইল চেয়ারে একা যাচ্ছেন কেন? কয়সর ভাই বললেন, একা কই, তুমি আছ? কয়সর ভাই বললেন, কোন কিন্তু বুঝিনা, তুমি আমকে লুক আফটার করবে প্লিজ।আমিতো অবাক।কি বলবো কিছুই বুঝে উঠতে পারিনি। ইতোমধ্যেই রয়াল জর্ডান এয়ার লাইন্সে ডাক চলে আসায় কয়সর ভাইকে নিয়ে চেক আপ করে বোর্ডিং পাস সংগ্রহ করি। এসময় আরো একজন বয়োবৃদ্ধ মুরুব্বী শামসুল ইসলাম সাহেবের সাক্ষাত হয়। উনার ভাতিজা উনাকে নিয়ে এসেছেন। আমাদের সঙ্গী। দুজনেরই দেখভালের ভার আমার উপর।আল্লাহর হাজার শোকর আদায় করে দুই বয়োবৃদ্ধ মুরুব্বীকে নিয়ে হিথরো ইমিগ্রেশনে পৌছলাম। তখনও আমার ইমাম সাহেব ইমাম ফরিদ আহমেদের সাথে আনুষ্ঠানিক পরিচয় পর্ব সম্পন্ন হয়নি। ট্রাফিকজ্যামের অজুহাতে তাহের ভাইও হিথরোতে পৌছতে দেরি হচ্ছে।

Image may contain: 4 people, including Kalam Choudhury and সেলিমের খবর, people sitting, people eating, table, food and indoor

০৩) জর্ডানে যখন পৌছলাম, মাশাআল্লাহ আসহাবে কাহাফ ও নবি শোয়েব আলাইহি ওয়াসাল্লামের কবর জেয়ারতের পর কয়সর সৈয়দ ও শামসুল ইসলাম সাহেব দুজনেই অনেক সুস্থ্য বলা যায় নব প্রাণ ফিরে পেলেন। আমিও অনেকটা অবাক। কয়সর ভাই জর্ডানে এমনভাবে বলা যায় শক্তভাবে একজন বড় ভাইয়ের মতোই কলিজার সব টুকু দরদ দিয়ে আমাকে সাথে রাখলেন।একটি টাকাও খরচ করতে দিলেননা।উপরন্ত জোর করে আমার হাতে হাত খরচের জর্ডানি মুদ্রা রাখতে বাধ্য করলেন। আমি অপারগতা প্রকাশ করলে তাহের ভাই আমাকে আদেশ করলেন রেখে দিতে।

০৪) আল আকসাতে বিশাল কম্পাউন্ড মূল মসজিদ সোলেমানি মসজিদ সবই কয়সর ভাই আগ্রহভরে দেখলেন। দোয়া দুরুদ আর গোণাহ মাফির জন্য কান্নাকাটি করলেন। একদিন আল আকসা মসজিদে জোহরের নামায পড়ে আমি বসে আছি, সবাইকে বললাম, আমি আর একেবারে এশার নামাজ পড়ে ভিক্টোরিয়াতে ফিরবো। অন্যদেরমতো কয়সর সৈয়দও আমার সাথে মসজিদে থেকে গেলেন। আমি বললাম আপনি অসুস্থ্য, ট্যাক্সি করে আপনাকে হোটেলে পাঠিয়ে দেই। রেস্ট নেন। নামাযের সময় আসবেন। উনি বললেন, ভাইরে আর কী আসতে পারবো-আল্লাহ চাইলে আসবো, নাহলে..। তোমার সাথে থাকি। তুমি কোরআন তেলাওয়াত করো, আমি তাসবীহ, নামায পড়ি। উনাকে চেয়ারে বসিয়ে আমি তেলাওয়াত করতেছি। বিশাল মসজিদে তখন মুসল্লী খুব বেশী নয়। তার উপর খুব ঠান্ডা এবং বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে। এমন সময় খুব প্রচন্ড এক সাউন্ড পেলাম। পেছনে থাকিয়ে দেখি কয়সর ভাই চেয়ার সমেত উল্টোদিকে পড়ে আছেন। আমি চীৎকার করে দৌড়ে উনাকে কোলে নিলাম। আমার ভয়কে দূর করে মুক্তিযোদ্ধা কয়সর বলে উঠলেন, ভয় পেয়োনা, আমি ঠিক আছি, আমাকে উঠাও। চিন্তা করোনা। আমি উনাকে বসিয়ে জোরাজুরি করি হোটেলে নিয়ে যেতে। উনি যেতে চাইলেননা। সেদিন উনি আল আকসাতে একেবারে এশার নামায পড়ে আল্লাহর দরবারে দোয়া দুরুদ করে হোটেলে ফিরলেন। আমি যখন তাহাজ্জুদের জন্য একা একা মসজিদে আসছি, আমাকে অবাক করে দিয়ে কয়সর ভাই আল আকসাতে তাহাজ্জুদের জন্য এই ঠান্ডার মধ্যে চলে আসেন। আমাকে অভয় দিয়ে বলেন, সেলিম আমি এখন সুস্থ্য। ভয় পেয়োনা, তুমি রাগ করোনা, আমি আসছি এবাদতের জন্য। এটাই আমার সুযোগ।

 

০৫) মক্কায় পৌছে ঐদিনই যত্নের সাথে আমাদের সঙ্গে কোন রকম বিশ্রাম ছাড়াই কয়সর ভাই উমরাহ পালন করলেন। তাওয়াফ, মাকামে ইবরাহিমে নামায, হাতিমে নামায, হাজরে আসওয়াদে চুমো, সাফা মারওয়ায় সাঈয়ী সবই করলেন অত্যন্ত সফলতার সাথে। আমরাও কয়সর ভাইয়ের এমন ষ্টেমিনায় হতবাক হয়ে যাই। প্রচন্ড ভীড়ের মধ্যে হাজরে আসওয়াদে চুমো দেয়া, আল্লাহর ঘরের দরজা বরাবর দোয়া আর দরজা ধরে কান্না চাট্রিখানি কথা নয়।উমরাহ পালনের পর কয়সর ভাইকে বেশ সতেজ এবং ফ্রেশ লাগছিলো। তিনি নিজেও বলছিলেন তিনি সুস্থ্য হয়ে গেছেন। পরদিন কাবাঘরের মসজিদে অবিশ্বাস্যভাবে আল আকসার মতোই কয়সর ভাই চেয়ারের বসা থাকা অবস্থায় উল্টোদিকে পড়ে গেলেন। সেদিনও আল্লাহর রহমতে উনাকে আমি সুস্থ্য করে তোলার সুযোগ পাই।

 

০৬) মক্কা থেকে মদীনা মুনওয়ারায় পৌছেই কয়সর ভাই অসম্ভব এক সঞ্জীবনী শক্তি নিয়ে নবীজীর রওজায়  সালাম সালাত আর দুরুদ পেশ করলেন, একই সাথে তিন ঘন্টা লাইনে দাঁড়িয়ে রওজাতুল(রিয়াজুল) জান্নাতে ১২ রাকায়াত নামায আদায় করলেন এবং দোয়া করলেন খুব আবেগ প্রবণ হয়ে। এরপর কয়সর ভাইকে খুব সতেজ লাগছিলো। আগের মতো চির যুবকের তাজা প্রাণ আর সবার সাথেই খুব হাসি খুশি করছিলেন। কিন্তু আমি যদি কখনো চোখের পলকে উনার আড়ালে হলেই উনি পেরেশান হয়ে যেতেন আমি কোথায়-যেন আমাকে না দেখলে উনি খুব অসহায় ফিল করতেন। সবাইকে জিজ্ঞেস করতেন ।মদীনায়ও কয়সরভাই জর্ডান ও প্যালেস্টাইনের মতো আমার হাত খরচ করতেই দেননি।

লন্ডনে এসে মৃত্যুর আগের দিন আমাকে ফোন করলেন। আল্লাহর ঘরের ছবি দিয়ে বললেন তোমার কাছেই রেখে গেলাম। তুমি সাংবাদিক মানুষ তোমার কাজে লাগবে। তুমি আমাকে এতো হেল্প করেছ সেলিম, আমি তোমার কাছে কৃতজ্ঞ। আমি হতবাক এবং কিংকর্তব্য বিমূঢ় হয়ে যাই। অভয় দিয়ে বলি, কি যে বলেন, এতো আমার ফরজ। আর ইনশাআল্লাহ আবারও হলি সিটি সফরে যাবো, দোয়া করেন আল্লাহপাক যেন ফের আশা পূরণ করেন। পরদিন সাংবাদিক প্রিয় তাহের ভাই ফোন করে জানালেন কয়সর ভাই এর অবস্থা সিরিয়াস, হাসপাতালে। দোয়া করতে বললেন। কয়েকঘন্টা পর তাহের ভাই যখন ফের কল করলেন তখন বুক চিড়ে উঠলো। যাই ভাবলাম, তাহের ভাই কান্নাজড়িত কন্ঠে সেই সংবাদই দিলেন, প্রিয় কয়সর সৈয়দ আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন।

 

কয়সর ভাইয়ের চলে যাওয়া আমাদের জন্য এক বড় রকমের শিক্ষা। আল্লাহপাক, যাকে মায়া করতে চান, তাকে এভাবেই অসুস্থ্য এবং হুইলচেয়ারে অবস্থায়ও তার পবিত্র ঘরসমূহ, নবী রাসূলদের রওজা, হাজরে আসওয়াদ চুমো দিয়ে মাফির বন্দোবস্তু করে নিয়ে যান। নবীজী বলেছেন, আল আকসা থেকে এহরাম বেধে উমরাহ পালন করলে পেছনের সব গোনাহ মাফ হয়ে যায়। আসমান জমিন চৌচির হয়ে যেতে পারে, প্রিয় নবীজীর একটি অক্ষরও এদিক সেদিক হতে পারেনা। প্রিয় কয়সর সৈয়দ আল্লাহপাক আপনাকে জান্নাতের সর্বোচ্চ মাকামে আসীন করেন-এই দোয়াই করি আল্লাহপাকের এক নগন্য এই গোলাম।

 

salim932@googlemail.com

17 January 2019, London.

Comments are closed.







পাঠক

Flag Counter



Developed By : ICT SYLHET

Developer : Ashraful Islam

Developer Email : programmerashraful@gmail.com

Developer Phone : +8801737963893

Developer Skype : ashraful.islam625

error: Content is protected !!