রাতে ব্যালট ভর্তি, প্রভোস্ট প্রত্যাহার, ক্ষোভ, বর্জন ও ডাকসু নির্বাচনে উত্তাল ক্যাম্পাস

প্রকাশিত: ৯:০৬ পূর্বাহ্ণ, মার্চ ১১, ২০১৯ | আপডেট: ৯:০৬:পূর্বাহ্ণ, মার্চ ১১, ২০১৯

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার। ঢাকা প্রতিনিধি । সংবাদ দাতা, ঢাঃবিঃ।ঢাকা বিশ্ববিদ্যায় কেন্দ্রীয় সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ তুলে ছাত্রলীগ ছাড়া সব প্যানেলের প্রার্থীরা এরই মধ্যে ভোট বর্জন করেছে। জাল ভোট প্রদান, সিলযুক্ত ব্যাটল বাক্স উদ্ধার, প্রার্থীদের মারধরসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে সকাল থেকে। তারই জের ধরে পুরো ক্যাম্পাসে শুরু হয়েছে বিক্ষোভ। ঢাবির প্রায় সবকটি স্থানই এখন শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে উঠেছে।

ভোটগ্রহণ চলাকালেই অধিকাংশ শিক্ষার্থী টিএসসি, মহসীন হল, রোকেয়া হল, কুয়েত মৈত্রী হলের সামনে ও ভিসি ভবনের সামনে বিক্ষোভ করছেন। দুপুর ১টার দিকে ছাত্র  অধিকার সংরক্ষণসহ চারটি প্যানেলের প্রার্থীরা মধুর ক্যান্টিনে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে ভোট বর্জনের ঘোষণা দেয়। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে মিছিল নিয়ে বের হয়।

দুপুর সোয়া ২টার দিকে ভিসি চত্বরের সামনে উপাচার্যের পদত্যাগ ও পুনঃনির্বাচনের দাবিতে বিক্ষোভ শুরু করে। একই চিত্র দেখা গেছে রোকেয়া হল ও শামসুন্নাহার হল প্রাঙ্গনেও।

সেখানেও শিক্ষার্থীরা ভোটে অনিয়মের অভিযোগ তুলে বিক্ষোভ করছে। একই সঙ্গে উপাচার্যের পদত্যাগ ও পুননির্বাচনের দাবি করছেন।

বেলা সাড়ে ১২টার দিকে রোকেয়া হলের প্রভোস্ট বন্ধ থাকা নির্বাচন ৩টা থেকে আবার শুরু হবে এমন ঘোষণা দিলে ছাত্রীরা প্রতিবাদে ফেটে পড়েন। তারা ভুয়া ভুয়া বলে চিৎকার করে বলেন, আমরা এই নির্বাচন বাতিল করে নতুন নির্বাচন চাই। একই সঙ্গে হল প্রশাসনের পদত্যাগ দাবি করেন ছাত্রীরা।

এদিকে, দুপুর ২টার দিকে আমাদের রিপোর্টার ঢাবি থেকে জানিয়েছেন, জিয়া হল, বঙ্গবন্ধু হল, সূর্যসেন হল ও জসীমউদ্দীন হলের ফটক বন্ধ করে দিয়ে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের ভেতরে আটকে রাখা হয়েছে।

টিএসসি এলাকায় বিক্ষোভকালে ছাত্রফ্রন্টের সাধারণ সম্পাদক সালমান সিদ্দিকী বলেন, ভোটে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে। ছেলে ও মেয়ে উভয় হলেই অনিয়ম দেখা গেছে। সারাদিন ভোটের নামে নাটক চলেছে।

ছাত্রলীগ ছাড়া সব প্যানেলের ভোট বর্জনের ঘোষণা-প্রহসনের ভোটের আয়োজন করায় বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশাসনের প্রতি ‘ঘৃণা’ জানিয়ে ভোট বর্জনের ঘোষণা দিয়েছে তারা। পাশাপাশি নতুন করে তফসিল ঘোষণা করে পুনঃভোট আয়োজনের দাবি জানিয়েছেন তারা।

সোমবার দুপুর ১টায় মধুর ক্যান্টিনে সংবাদ সম্মেলন করে তারা এ নির্বাচন প্রত্যাখ্যানের ঘোষণা দেয়। একই সঙ্গে তারা আগামীকাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস বর্জনের ডাক দিয়েছে।

ভোট বর্জনের ঘোষণা দেয়া চারটি প্যানেল হচ্ছে- বাম সংগঠনগুলোর জোট প্রগতিশীল ছাত্র ঐক্য, কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের প্লাটফর্ম বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ, স্বাধিকার স্বতন্ত্র পরিষদ ও স্বতন্ত্র জোট।

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, প্রহসন-জালিয়াতির এই নির্বাচন বাতিল করে পুনঃতফসিল ঘোষণা করতে হবে। হলে নয়, নতুনভাবে ভোট হতে হবে একাডেমিক ভবনে। সেই নির্বাচনে ব্যালটবাক্স হতে হবে স্বচ্ছ।

এ ছাড়া এই ভোট জালিয়াতির প্রতিবাদে আগামীকাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস বর্জন কর্মসূচির ডাক দেয়া হয়েছে জোটগুলোর পক্ষ থেকে।

সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন বাম সংগঠনগুলোর জোট প্রগতিশীল ছাত্র ঐক্যের সহসভাপতি (ভিপি) প্রার্থী লিটন নন্দী। তিনি বিভিন্ন হলে বিভিন্ন অনিয়ম তুলে ধরেন। কুয়েত মৈত্রী হলে জালভোট মারা ব্যালট উদ্ধারের ঘটনায় নিন্দা জানান।

হাজী মুহম্মদ মুহসীন হলে ভোটকেন্দ্র পরিদর্শনে গেলে প্রগতিশীল ছাত্র ঐক্যের প্রার্থী-কর্মীদের ধাওয়া দেয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। এ ঘটনায় ছাত্রলীগকে অভিযুক্ত করছেন ঐক্যের নেতারা।

রোকেয়া হলে ট্রাংকভর্তি ব্যালট উদ্ধার-ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) এবং হল সংসদ নির্বাচনে বেগম রোকেয়া হলের ভোটগ্রহণ কক্ষের পেছনের আরেকটি কক্ষে ব্যালট পেপার বোঝাই ট্রাংক পাওয়া গেছে।

সোমবার বেলা ১২টার দিকে ট্রাংকভর্তি ব্যালট পেপার পাওয়ার পর স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থকরা তা ছিনিয়ে নিয়ে যায়।

রোকেয়া হলের রিটার্নিং কর্মকর্তা অধ্যাপক ফারহানা ফেরদৌসী বলেন, উত্তেজিত শিক্ষার্থীরা দুই হাজার ৬০৭টি ব্যালট পেপার ছিনিয়ে নিয়ে গেছে। এ কারণে বেলা সোয়া ১২টা থেকে ভোটগ্রহণ বন্ধ রাখা হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৮টি হল মিলিয়ে এ নির্বাচনে ভোটার সংখ্যা ৪৩ হাজার ২৫৫ জন। এর মধ্যে রোকেয়া হলের ভোটার তিন হাজার ৭১৮ জন।

সোমবার সকাল ৮টা থেকে সব হলে একসঙ্গে ভোট শুরুর কথা থাকলেও ব্যালটবাক্স সিলগালা করা নিয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে রিটার্নিং কর্মকর্তা ও প্রভোস্টের বাদানুবাদ নিয়ে এক ঘণ্টা দেরিতে ভোটগ্রহণ শুরু হয়।

বামজোট থেকে রোকেয়া হলের জিএস প্রার্থী মুনিরা দিলশাদ ইরা অভিযোগ করে বলেন, সকালে যখন ভোটগ্রহণ শুরু হয়, তখন আমরা ব্যালটবাক্স দেখতে চাইলেও দেখানো হয়নি। পরে আমরা বিক্ষোভ শুরু করলে ৯টার দিকে ব্যালটবাক্স দেখানো হয়। রোকেয়া হলে ব্যালটবাক্স থাকার কথা ৯টি। তবে আমাদের দেখানো হয়েছে ছয়টি।

তিনি বলেন, রোকেয়া হলে ভোটকেন্দ্র করা হয়েছে টিভিরুমে। সেখানে গণমাধ্যমকর্মীদের যেতে দেয়া হচ্ছে না। হলগেট থেকে বলা হচ্ছে- এখন ভেতরে যাওয়া যাবে না।

ভোট দেরিতে শুরু করার কারণ সম্পর্কে রোকেয়া হলের প্রশাসনিক কর্মকর্তা সালমা আক্তার বলেন, কিছু জটিলতার কারণে নির্ধারিত সময়ে ভোট শুরু করা যায়নি। তবে কী ধরনের জটিলতা সে বিষয়ে তিনি কিছু বলতে রাজি হননি।

ছাত্রদলের জিএস প্রার্থী আনিসুল হক অনিক অভিযোগ করে বলেন, প্রভোস্ট ম্যাডামকে বলার পর ৯টায় ভোটগ্রহণ শুরু হয়েছে। দেরি করার যৌক্তির কারণ দেখি না। এর কোনো ব্যাখ্যাও দেয়া হয়নি।

পরে দু-একজন সাংবাদিককে নিয়ে আমরা তার কাছে গেলে তিনি তাদের সামনে ব্যালটবাক্স সিলগালা করেন।

জাল ভোটে ছেয়ে গেলো প্রোভিসি’র গাড়ি

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচনে বস্তা ভর্তি সিলযুক্ত ব্যালট উদ্ধার করা হয়। সিলগুলো ছিলো ছাত্রলীগ প্যানেলের প্রার্থীর পক্ষে। ডাকসু নির্বাচনের ভোটগ্রহণ শুরু হওয়ার আগেই রাতের আঁধারে জাল ভোট দিয়ে ব্যালট বাক্সে ভরে রাখার অভিযোগে শিক্ষার্থীরা প্রো ভিসি (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ সামাদ ও প্রক্টর ড. এ কে এম গোলাম রাব্বানিকে অবরোধ করে রাখেন। এসময় বিক্ষুব্ধ ছাত্রীরা প্রোভিসির গাড়িতে জাল ভোটের ব্যালট দিয়ে ঢেকে দিয়েছে।

কুয়েত মৈত্রী হলের প্রভোস্টকে অপসারণ-

কুয়েত মৈত্রী হলের ভারপ্রাপ্ত প্রোভোস্ট শবনব জাহানকে অপসারণ করা হয়েছে। সিলামারা বস্তা ভর্তি ব্যালট পেপার পাওয়া যাওয়া এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। নতুন প্রভোস্টের দায়িত্ব পেয়েছেন মাহবুবা নাসরিন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচনে ভোটগ্রহণ শুরু হয় সকাল ৮টায়। কুয়েত মৈত্রী হলে ভোটের আগের রাতেই ব্যালট বাক্সে সিল মারা অবস্থায় বস্তা উদ্ধার করে ছাত্রীরা। শত শত ব্যালট হাতে বেরিয়ে আসেন ছাত্রীরা। তাদের অভিযোগের সত্যতা প্রমানিত হলে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কুয়েত মৈত্রী হলে ভোটগ্রহণ স্থগিত করে দেন। এরপর ফের ভোটগ্রহণ শুরু হয়।