আপডেট ৪ ঘন্টা আগে ঢাকা, ১৬ই জুন, ২০১৯ ইং, ২রা আষাঢ়, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১২ই শাওয়াল, ১৪৪০ হিজরী

Breaking News
{"effect":"fade","fontstyle":"normal","autoplay":"true","timer":4000}

প্রচ্ছদ মুক্তমত

Share Button

কুড়া পাখি এবং হাছনরাজার কুড়া শিকার

| ০২:৫৪, মার্চ ২২, ২০১৯

কুড়া পাখি এবং হাছনরাজার কুড়া শিকার

-হাসনাত মুহ. আনোয়ার

আল্লা আল্লা বল ভাই আল্লার নাম সার
মুহাম্মদ মুস্তফার নামে হইয়া যাইবায় পার।।
ভালাবুরা কোড়ার যত করিব বয়ান
না লেখিলে তুষ্ট নাহি হয় মনপ্রাণ ।।
বহুত শিকারী যে কোড়া নাহি চিনে
তে কারণে ‘আইব খাতা’ লিখতে হইল মনে ।।
– হাছনরাজা (সৌখীন বাহার কাব্য)

এক সময় কুড়া/কোড়া পাখি বাংলার এক বহুল পরিচিত পাখী হলেও আজকাল হয়তো অনেকেই এ পাখি চিনেন না। কুড়া শিকারী বিনন্দের পালাগানে আর হাছন রাজার জীবন কাহিনীতে কুড়া পাখির কথা অনেক শুনেছি।

এর ইংরেজী নাম হলো Watercock, বাংলায় একে জল মোরগও বলা হয়। অন লাইনে ▪️ঈগল পাখিকে ও কোড়া বলে উল্লেখ করা হয়েছে বলে দেখলাম ! আমাদের ভাওয়াইয়া গানে ঈগল বা চিলকে ‘ কুরুয়া’ বলে উল্লেখ দেখতে পাই। যেমন একটি ভাওয়ইয়া গানে পাই:
আজি না কান্দিস না কান্দিসরে কুরুয়া
নিঝুম পাথার রাতি,
একলা ঘরে আছোং শুইয়া
সংগে নাই মোর সাথিরে …
আজি না কান্দিস না কান্দিস কুরুয়ারে ।।

এখানে কুরুয়া বলতে ঈগল বা চিল পাখিকেই বুঝানো হয়েছে। এভাবে ভাওয়াইয়া গানে কুরুয়া শব্দের অনেক উদাহরণ আমরা দেখি ।
সিলেটের কোন কোন এলাকায় ও চিলকে কুরুয়া/ বলওয়া বলতে শুনেছি। তবে কুরুয়া আর কুড়া আলাদা দুই পাখি, এক নয়।
উচ্চারণ ভেদে কুরুয়া ই কুড়া বলে মনে হতে পারে । আবার কোন কোন অঞ্চলে মোরগকেই কুড়া বলা হয়। মোটকথা কুড়া পাখিকে নিয়ে বিভ্রান্ত হবার যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে।
তাই চলুন না ‘আসল’ কুড়া পাখি চিনে নেই:
আমাদের লোক কথা ও সঙ্গীতে আমরা কুড়া পাখির নাম শুনি। খুবই আকর্ষণীয় এক প্রকার পাখী-কুড়া। এই পাখি পানির উপর ভাসমান জলজ উদ্ভিদ ও খড়কুটোর মধ্যই থাকে । পোকা মাকড়, ছোটমাছ ইত্যাদি তার প্রধান খাবার। পুরুষ পাখী প্রজনন মৌসুমে নারী কুড়াকে আকৃষ্ট করতে এবং তার বীরত্ব জাহির করতে ‘ডুব’ ‘ডুব’ করে এক প্রকার শব্দ করে ডাকে। এ ডাক শুনতে বেশ মধুর। এভাবে আশেপাশে অবস্থিত অন্য পুরুষ কুড়া পাখিকে ও চ্যালেঞ্জ জানায়। এতে নারী পাখি আকৃষ্ট হয়ে কাছে চলে আসে আবার কোন পুরুষ পাখি চলে আসে, চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে। বেঁধে যায় প্রচন্ড লড়াই। লড়াইয়ে পরাজিত পাখি পলায়ন করে ফলে বিজয়ী কুড়া নারী পাখির সাথে মিলে ‘সুখের নীড়’ রচনা করে, নারী কুড়া ডিম দেয়।
কুড়ার লড়াই অনেকটা মোরগের লড়াই এর মতোই, তবে লড়াইরত অবস্থায় একটি আরেকটিকে দুই পায়ে বেষ্টন করে দীর্ঘক্ষণ ধরে রাখে। শিকারীগন এ সুযাগ গ্রহণ করেন। তারা দৌড় দিয়ে গিয়ে উভয়টিকে ধরে ফেলেন।
কুড়া শিকারী গন তাদের পোষা কুড়াকে লড়াই এর জন্য ছেড়ে দেন। পোষা কুড়া লড়াই করতে করতে যখন দু পা দিয়ে বুনো/ জংলী পাখিকে ধরে রাখে এ সুযোগে শিকারী কাছে গিয়ে উভয়টিকেই ধরে ফেলেন। কুড়া শিকার এক সময় বৃহত্তর সিলেট ও ময়মনসিংহের হাওর অঞ্চলে খুবই জনপ্রিয় ছিলো। আমার ছেলেবেলা কুড়া শিকারে গিয়েছি আমার এক আত্মীয়ের সাথে। আসলেই এ এক মজার অভিজ্ঞতা।
মরমী কবি হাছন রাজা নিজেই ছিলেন এমনি এক কুড়া শিকারী। হাছন রাজা কুড়া, ঘোড়া, দোয়েল এবং হাতী পালতেন। শুধু তাই নয়, এ নিয়ে পুঁথিও লিখেছেন। এর নাম- শৌখীন বাহার। তাঁর জীবদ্দশায়ই বাংলা হরফে এ বই ছাপা হয়। এছাড়াও হাছন রাজা কুড়া শিকার নিয়ে অনেক কাহিনী রয়েছে।
তিনি প্রকৃত অর্থেই ছিলেন একজন কুড়া শিকারী। বর্ষা এলেই পাইক বরকন্দাজ নিয়ে বজরা ভাসিয়ে মহা ধুমধামে বেরিয়ে পড়তেন কুড়া শিকারে। তাই তো তিনি লিখেন:
.
”এই দোয়া কর মমিন মছলমান ভাই,
বেহেশ্তে গিয়া যেন কুড়া শিকার পাই” ।।
আজকাল আর কুড়া পাখি দেখা যায়না। ডাক শোনা বা শিকার করা তো দুরের কথা। জলাভূমির পরিমান কমে যাওয়া , পরিবেশ দুষণ, বিষাক্ত কীটনাশক পানিতে মিশে পাখ পাখালির বেঁচে থাকা অসম্ভব করে তুলেছে। ফলে আমাদের জীবন ও হুমকীর সম্মূখীন হয়ে পড়েছে। আসুন পরিবেশের প্রতি যত্নবান হই, আমাদেরই বাঁচার তাগিদে।
-হাসনাত মুহ. আনোয়ার
শেকড়সন্ধানী লেখক, গবেষক, গীতিকার ও পূথিকার।

Comments are closed.







পাঠক

Flag Counter



Developed By : ICT SYLHET

Developer : Ashraful Islam

Developer Email : programmerashraful@gmail.com

Developer Phone : +8801737963893

Developer Skype : ashraful.islam625

error: Content is protected !!