আপডেট ২ min আগে ঢাকা, ১৯শে জুন, ২০১৯ ইং, ৫ই আষাঢ়, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১৫ই শাওয়াল, ১৪৪০ হিজরী

Breaking News
{"effect":"fade","fontstyle":"normal","autoplay":"true","timer":4000}

প্রচ্ছদ অগ্রযাত্রা

Share Button

উন্নয়নের দ্বিতীয় অধ্যায়টা সামনে আনা জরুরি

| ০০:০৯, মার্চ ২৬, ২০১৯

হোসেন জিল্লুর রহমান । অর্থনীতিবিদ । সাবেক উপদেষ্ঠা । তত্বাবধায়ক সরকার। বাংলাদেশের ৪৮ বছরের অর্থনীতির বিবর্তনে যে বিষয়গুলো প্রথমে বলা দরকার, তা হলো অর্জনের জায়গাগুলো। সেটা হচ্ছে আমাদের অত্যন্ত ভঙ্গুর ও দারিদ্র্য অবস্থা থেকে যাত্রা শুরু হয়েছে। শুধু দরিদ্র ছিলাম তা নয়, ভঙ্গুরও ছিলাম। ভঙ্গুর মানে হচ্ছে, কোনো একটি দুর্যোগ, সেটা প্রাকৃতিক হোক বা অন্য ধরনের হোক, সংঘটিত হলে অর্থনীতি রীতিমতো ভেঙে পড়ত। একটা বড় বন্যা হলে ঘুরে দাঁড়াতে কয়েক  বছর লেগে যেত। আন্তর্জাতিক কোনো সমস্যা হলে বসে যেতে হতো এবং অর্থনীতিটা সেই অর্থে বিকশিত ছিল না। আমরা মূলত কৃষির ওপর নির্ভরশীল ছিলাম। ৪৮ বছরের এই যাত্রায় আমরা বড় ধরনের একটা পরিবর্তন ঘটাতে সক্ষম হয়েছি, একটা সবল ভিত্তির ওপর নিজেদের দাঁড় করিয়েছি। ঝুঁকি অনেক আছে, কিন্তু সহজে ভেঙে পড়ার আশঙ্কা নেই। একদম ভেঙে পড়ার বিষয়টা সামাল দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। দারিদ্র্যের বিষয়টাও অনেকটা অতিক্রম করা গেছে। এখানে বলার বিষয় হচ্ছে, দারিদ্র্যের এক ধরনের চেহারা থেকে আমরা উঠে এসেছি, ওই চেহারাটা ছিল বছরের কিছু কিছু সময় ধরে তিনবেলা না খেয়ে থাকা পরিবার, কয়েক মাস ধরে একবেলা খাচ্ছে এমন পরিবার। দারিদ্র্যের এই চেহারাটা বর্তমানে নেই, যেটা ৭০ দশকে ছিল।

কিন্তু তার মানে এই নয় যে, দারিদ্র্য চলে গেছে। দারিদ্র্যের চরিত্রটা বদলেছে। চরম দারিদ্র্যের পরিস্থিতি থেকে আমরা উঠে এসেছি। কিন্তু দারিদ্র্যের নতুন আরেকটি দিক আছে, যেমন অপুষ্টি। ক্ষুধা হয়তো নিবারণ হয়েছে কিন্তু অপুষ্টির ব্যাপারটি ব্যাপকভাবে রয়ে গেছে। বিষয়গুলো মাথায় না এনে আমরা অগ্রগতির কথা চিন্তা করলে, আমরা কীভাবে এগোলাম তা বোঝা যাবে না। সুতরাং আমরা ভঙ্গুর দরিদ্র অবস্থা থেকে দারিদ্র্যের কিছু কিছু দিক অতিক্রম করে সবল একটা ভিত্তি তৈরি করেছি এবং অর্থনীতির খাতওয়ারি বিকাশও ঘটেছে।

আগে খাত একটাই ছিল। তা হলো কৃষি আর ক্ষুদ্র শিল্প, কিছু ছিল ঐতিহাসিক সূত্রে প্রাপ্ত জুট মিল ইত্যাদি। কিন্তু এখন নতুন খাত তৈরি হয়েছে। যেমন তৈরি পোশাক খাত। প্রবাসী আয়ের কথা জানি। আরও নতুন নতুন দেশীয় শিল্পের বিকাশ ঘটেছে। সেবা খাতেরও অনেক উন্নতি ঘটেছে। আগে আমাদের আরেকটা বৈশিষ্ট্য ছিল। বাংলাদেশ যদিও একটা দেশ ছিল কিন্তু এখানে ছোট ছোট বিচ্ছিন্ন অর্থনীতি ছিল। তার মানে হচ্ছে, ঢাকা একটা অর্থনীতি, সাতক্ষীরা ছোট আরেকটি অর্থনীতি। এগুলোর মধ্যে যোগাযোগ ছিল না। একটা বিচ্ছিন্ন অর্থনীতির আমেজ ছিল। যোগাযোগ কেন হবে, ওই এলাকায় কে যাবে, কেন যাবে? কেননা, তখন তো একটি এলাকায় ধান উৎপাদন হয়ে ওখানকার লোকজন খাচ্ছে, অথবা ধানটা না হয় এদিক-ওদিক যাচ্ছে, অন্য জিনিসগুলো তাও নয়। সে সময় সার্বিকভাবে অর্থনীতি বিচ্ছিন্নতা অতিক্রম করেনি এবং কোনো অবকাঠামোও ছিল না। রাস্তাঘাটও ওভাবে ছিল না। বিচ্ছিন্ন ও ক্ষুদ্র অর্থনীতির অবস্থান থেকে সার্বিকভাবে একটা জাতীয় অর্থনীতির বাস্তবতা আমরা তৈরি করেছি।

কুষ্টিয়ার কৃষক এখন ঢাকার বাজারে বিক্রি করছে, ঢাকা থেকে তৈরি একটা জিনিস যেমন ঈদের পোশাক হয়তো সাতক্ষীরায় বিক্রি হচ্ছে। এ বিষয়টা একটা ভিন্ন বাস্তবতা তৈরি করেছে। এগুলো আমাদের সফলতার একটা দিক। বিচ্ছিন্নতা অতিক্রম করে অখণ্ড জাতীয় অর্থনীতির বাস্তবতা তৈরি করেছি। বিদেশের সঙ্গে যোগাযোগ আমাদের অনেকাংশে বেড়েছে। একই সঙ্গে আমরা একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় চলে এসেছি। ৪৮ বছরের মাথায় এই প্রথম এগোবার সুস্পষ্ট কিছু বিষয় আমরা দেখতে পাচ্ছি। তবে কী জিনিসগুলো, তা নিয়ে আমরা চিন্তা না করে আমাদের মধ্যে একটা আত্মপ্রসাদের প্রবণতা চলে এসেছে। যেন বিষয়টি চাঁদে পৌঁছে গেছি, এখন মঙ্গলে চলে যাব! এ ধরনের চিন্তা করাটা স্বভাবত বাস্তবকে দেখে চিন্তা করা হচ্ছে না।

অন্যান্য অনেক দেশে পরিবর্তন হলেও নির্দিষ্টভাবে আমার মনে হয় বাংলাদেশের পরিবর্তনের বৈশিষ্ট্যের আরেকটি দিক হচ্ছে এই যে, নানামুখী পরিবর্তন হয়েছে তা কিন্তু গুটিকয়েক মানুষের পরিবর্তন নয়। সার্বিকভাবে বড় ধরনের পরিবর্তন, সবাই সংশ্নিষ্ট হয়েছে এই পরিবর্তনে। মেয়েরা আগে এতটা অর্থনৈতিকভাবে জড়িত ছিল না, এখন অনেক বেশি হয়েছে।

আমাদের কৃষি খাতের উন্নয়নে কয়েকটি বড় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শুধু তা নয়, ছোট ছোট এ ধরনের অনেক উদ্যোগও রয়েছে। যেমন, আমাদের শাশ্বতকালের চেহারা লাঙ্গল তো প্রায় জাদুঘরে যাওয়ার মতো অবস্থায় চলে গেছে। কৃষিক্ষেত্রের সব জায়গায় মেশিন চলে এসেছে। এই যে নানা ধরনের পরিবর্তন হলো, পরিবর্তনের জায়গাগুলোতে আমরা অনেককেই সম্পৃক্ত করেছি কঠোর পরিশ্রম ও মেধার মাধ্যমে। বাংলাদেশের পরিবর্তনের আরেকটা বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, আমাদের পরিশ্রমী ও উদ্ভাবনী মানসিকতা। নির্দিষ্টভাবে বললে, এটা তৃণমূল পর্যায়ে খুব কাজে দিয়েছে। যেমন কৃষক দেখছে একজন একজাতের ফসল ভালো ফলাচ্ছে। পরে সে নিজে শুরু করেছে। গার্মেন্ট সেক্টর এক-দু’জন শুরু করেছিল, পরে অনেকেই জড়িত হয়ে একধরনের দক্ষতা তৈরি করেছে। এই পরিশ্রমী ও উদ্ভাবনী মানসিকতা হচ্ছে অর্থনৈতিক পরিবর্তনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

এগুলো হচ্ছে একটা গল্পের প্রথম অধ্যায়। আমরা এগোলাম। কিন্তু প্রথম অধ্যায় দিয়ে সার্বিক উপন্যাস হয় না। এর জন্য আরও অধ্যায়ের প্রয়োজন। দ্বিতীয় অধ্যায়টা এখন সামনে আনা জরুরি। আজকে বাংলাদেশ যে জায়গায় দাঁড়িয়েছে, সে জায়গাটা হচ্ছে একটা শক্তির জায়গা। যেখান থেকে আমাদের আরও উচ্চকাঙ্ক্ষী স্বপ্ন দেখার সাহস তৈরি করেছে মধ্যম আয়ের দেশ হবো বলে। এখন যেসব দেশ এ ধরনের সাহসী স্বপ্ন দেখতে শুরু করে, তাদের কিন্তু ওই স্বপ্ন অর্জন করতে হলে মানসিক কাঠামোতে একটা পরিবর্তন আনা জরুরি। সে কাঠামোটা হচ্ছে, আমরা এখন এ অবস্থা থেকে এগোচ্ছি কি-না, ‘৭১-এর তুলনায় নয় বরং বর্তমান থেকে এগোচ্ছি কি-না। তখন কিন্তু আমরা বারবার অতীতের সঙ্গে তুলনা করে চিন্তা করব না। আমাদের তুলনা করতে হবে আমাদের মতো অন্যান্য যেসব দেশ আছে তাদের তুলনায় কীভাবে এগোচ্ছি। এটাই হচ্ছে দ্বিতীয় অধ্যায়ের বিষয়। দ্বিতীয় অধ্যায়ে এসে আমাদের চিন্তা করতে হবে, আমরা এখন বিশ্বঅর্থনীতির অংশ। সার্বিকভাবে এটার ওপর আমরা নির্ভরশীল। প্রযুক্তি বলি, ব্যবসা বলি, যাতায়াত বলি- সবকিছুই এর ওপর নির্ভরশীল। অতএব, দ্বিতীয় অধ্যায়ে আমাদের মতো দেশগুলো কীভাবে এগোচ্ছে, অন্যদের গতির তুলনায় এগোচ্ছে কি-না কিংবা এগোবার ধরনের বিষয়টা গুরুত্বপূর্ণ। মূলত চ্যালেঞ্জটা এখানে রয়ে গেছে।

 

 

 

Comments are closed.







পাঠক

Flag Counter



Developed By : ICT SYLHET

Developer : Ashraful Islam

Developer Email : programmerashraful@gmail.com

Developer Phone : +8801737963893

Developer Skype : ashraful.islam625

error: Content is protected !!