আপডেট ৫ ঘন্টা আগে ঢাকা, ১৭ই জুন, ২০১৯ ইং, ৩রা আষাঢ়, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১৩ই শাওয়াল, ১৪৪০ হিজরী

Breaking News
{"effect":"fade","fontstyle":"normal","autoplay":"true","timer":4000}

প্রচ্ছদ অর্থ-বণিজ্য

Share Button

বিমানে সীমাহীন অনিয়ম-দুর্নীতি, সন্দেহভাজন দস্যু বিমান মাফিয়াদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা

| ০১:২৭, এপ্রিল ৯, ২০১৯

বিএম জাহাঙ্গীর ও মুজিব মাসুদ।বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের দুর্নীতিবাজ মাফিয়া চক্র ও গডফাদারদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। তারা যাতে কোনোভাবে দেশত্যাগ করতে না পারে সেজন্য অলিখিত এই সিদ্ধান্ত সোমবার শাহজালাল (র.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ দেশের সব আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও ইমিগ্রেশন পুলিশকে জানিয়ে দেয়া হয়েছে।

চক্রের সদস্যদের তালিকাসহ দুর্নীতির দলিল-দস্তাবেজ ও তথ্য-উপাত্ত দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) পাঠানো হয়েছে। নিশ্চিত করেছে, যে কোনো সময় এ চক্রের প্রত্যেকের পাসপোর্টও জব্দ করা হতে পারে। কেননা অনেকে দেশ ছাড়ার জন্য চেষ্টা করছে। দেশে-বিদেশে থাকা তাদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদসহ নামে-বেনামের যাবতীয় সম্পদের খোঁজ নিতে বলা হয়েছে।

দুদকও ইতিমধ্যে বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত একটি বিশেষ টিম প্রাপ্ত তথ্য উপাত্তের ভিত্তিতে কাজ শুরু করেছে। প্রাথমিক অবস্থায় সংস্থার মার্কেটিং অ্যান্ড সেলস বিভাগ, কার্গো শাখা ও প্রকৌশল শাখার অনিয়ম-দুর্নীতির তদন্ত করবে। পর্যায়ক্রমে অন্যান্য শাখার তদন্ত করবে।

এদিকে টিকিট ও কার্গো কেলেঙ্কারির অভিযোগে ওএসডি হওয়া পরিচালক মার্কেটিং অ্যান্ড সেলস আশরাফুল আলম ও যুক্তরাজ্যের সাবেক কান্ট্রি ম্যানেজার শফিকুল ইসলামসহ মার্কেটিং ও কার্গো শাখার দুর্নীতিবাজদের চূড়ান্ত তালিকা তৈরি করেছে মন্ত্রণালয়। এ তালিকাও সোমবার দুদকের কাছে পাঠানো হয়েছে।

পাশাপাশি চক্রের সব সদস্যকে নজরদারির আওতায় আনা হয়েছে। চক্রের অন্য সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন মতিঝিল বিক্রয় অফিসের সহকারী ম্যানেজার মো. এনায়েত হোসেন, সহকারী ম্যানেজার পারভেজ আলম, পরিতোষ তালুকদার, জিয়াউদ্দিন ঠাকুর, সোলায়মান রিয়াদ প্রমুখ।

এছাড়া মতিঝিল অফিসের সাবেক কর্মকর্তা শামসুল করিম, আতিকুর রহমান চিশতীর নামও রয়েছে এ তালিকায়। সংশ্লিষ্ট কয়েকটি নির্ভরযোগ্য সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

সূত্র বলছে, শুধু ইতিমধ্যে চিহ্নিত হওয়া এ সেক্টরের গডফাদারসহ মাফিয়া চক্র নয়, নেপথ্যে থেকে যারা এই চক্রকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়ে আসছে তাদেরও আইনের আওতায় আনা হবে। কাউকে ছাড় দেয়া হবে না। মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে প্রাথমিক যে অনুসন্ধান চালানো হয়েছে তাতে দেখা গেছে, বিমানের এই সীমাহীন অনিয়ম-দুর্নীতির সঙ্গে সরকারি দলের কোনো নেতা কিংবা রাজনীতিসংশ্লিষ্ট কেউ জড়িত নয়।

তা সত্ত্বেও যদি কারও সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায় সেক্ষেত্রেও সরকার জিরো টলারেন্স দেখাবে। সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের অনুমোদন নিয়ে বিমানের দুর্নীতিবাজদের এবার সমূলে উৎপাটন করতে কঠোর অবস্থান থেকে পিছু হটবে না মন্ত্রণালয়।

বেসামরিক বিমান চলাচল মন্ত্রণালয়ের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে নির্দেশনা রয়েছে, বিমানকে দুর্নীতিমুক্ত করে শতভাগ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। তাই দুর্নীতিবাজদের পক্ষে যারা তদবির করবে তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।

বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, একের পর এক দুর্নীতি, শীর্ষ কর্মকর্তাদের স্বেচ্ছাচারিতা ও ব্যবস্থাপনার ত্রুটির কারণে ইতিমধ্যে বড় ধরনের আর্থিক ঝুঁকিতে পড়েছে বিমান। মূলধনের তুলনায় প্রতিষ্ঠানটির ঋণের পরিমাণ এখন আড়াই গুণের বেশি। নতুন চার উড়োজাহাজ কেনার ঋণ যুক্ত করলে এটা বেড়ে প্রায় পাঁচ গুণে দাঁড়াবে। যা অঙ্কের হিসাবে ৯ হাজার কোটি টাকা। এর বাইরে সরকারের দুই প্রতিষ্ঠানের কাছে বিমানের দেনা রয়েছে ১ হাজার ৮৬২ কোটি টাকা।

সরকারের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানটিতে আর্থিক এই দুরবস্থার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে অব্যবস্থাপনা-অপচয়, অনিয়ম-দুর্নীতি। এমনকি অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষায় বিপুল অঙ্কের আর্থিক অনিয়ম ধরা পড়লেও ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। অথচ বাণিজ্যিকভাবে পরিচালনার লক্ষ্যে ২০০৭ সালে বিমানকে পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি করা হয়। এর শতভাগ মালিকানা সরকারের হাতেই রাখা হয়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, মালিকানা যেহেতু সরকারের, তাই একে রক্ষার দায়ও সরকারের।

দুর্নামের শেষ প্রান্তে তকমা পাওয়া বিমানকে এখন আর কেউ ঋণ দিতে চায় না। ঋণ পেতে হলে সরকারকে গ্যারান্টার হতে হয়। অথচ এই সংকট নিয়ে দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের কোনো মাথাব্যথা নেই। তারা আছেন বহাল-তবিয়তে। তাই বিলম্বে হলেও এই শ্বেতহস্তীর ভার এভাবে আর বহন করবে না। যারা বিমানকে এই পর্যায়ে নিয়ে এসেছে তাদের কাছ থেকে তিল তিল করে সব হিসাব নেয়া হবে।

প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সংকটের এই চিত্র বিমানের উচ্চপর্যায়ের প্রায় সবাই জানে। কিন্তু কেউ গা করছে না। অনিয়ম-দুর্নীতি-অপচয় বন্ধেও কোনো উদ্যোগ নেই। তবে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কার্গো শাখায় বিপুল অঙ্কের দুর্নীতি উদ্ঘাটিত হয়েছে বিমানের অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষায়। নিরীক্ষা প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৬ ও ২০১৭ সালে অনির্ধারিত মালবাহী ফ্লাইটে (নন-সিডিউল ফ্রেইটার) আসা এবং বিদেশে যাওয়া মালামাল থেকে আদায়যোগ্য মাশুল ৯০ লাখ ২৬ হাজার মার্কিন ডলার (৭২ কোটি টাকার বেশি) বিমানের কোষাগারে জমা পড়েনি।

২০০৮ সাল থেকে এই টাকা বিমানের কোষাগারে জমা দেয়া হয়নি। সব মিলিয়ে ১০ বছরে এই টাকার পরিমাণ ৭২০ কোটি টাকা। তবে বিমান মন্ত্রণালয় তদন্ত করে কার্গো শাখার এই অনিয়ম পেয়েছে ৪১২ কোটি টাকা। নিরীক্ষা শাখার এক কর্মকর্তা জানান, এই টাকা মূলত সিভিল এভিয়েশন ও বিমানের কয়েকজন দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারী মিলে লোপাট করেছে। বিমানের সব শাখায় মাশুল বা রাজস্ব আদায় করে হিসাব বা রাজস্ব শাখা। কিন্তু কার্গো হ্যান্ডলিং শাখার মাশুল আদায় করে বিপণন ও বিক্রয় শাখা।

বিমানের টিকিট বুকিং দেয়ার জন্য গ্লোবাল ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেম (জিডিএস) কোম্পানির সঙ্গে যে চুক্তি হয়েছে, তাও বিমানের স্বার্থবিরোধী। সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা জানান, ৩০০ আসনের একটি ফ্লাইটে ২ থেকে ৩ হাজার বুকিংও হয় অনেক সময়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেখা যায়, যার অধিকাংশ বুকিং বাতিল হয়েছে। অগত্যা বিমানকে খালি আসন নিয়ে উড্ডয়ন করতে হয়। বাস্তবতা হল, টিকিট দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত চক্রটি বেশির ভাগ টিকিট কালোবাজারে বেশি দামে বিক্রির আসায় আগাম বুকিং করে রাখে।

এবার তারা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত এ পন্থায় পকেট ভারি করার কাজে ব্যস্ত থাকে। কিন্তু এর ফলে শেষদিকে যেসব টিকিট আর বিক্রি হয় না ওই আসনগুলো খালি নিয়ে ফ্লাইট ছাড়তে হয়। এতে করে যা লোকসান হওয়ার তা বিমানেরই হয়। অপরদিকে প্রতিটি বুকিং বাতিলের জন্য জিডিএস কোম্পানিকে একটা মাশুল দিতে হয় বিমানকে।

গত মাসে জিডিএস কোম্পানির বিল ছিল ১৪ লাখ মার্কিন ডলার (প্রায় সাড়ে ১১ কোটি টাকা)। এ বিল ২২ লাখ ডলারও হয়েছে কোনো কোনো মাসে। অভিযোগ আছে, শুধু জিডিএসের বিল বাড়াতে কিছু ট্রাভেল এজেন্সি প্রচুর টিকিট বুকিং দেয়, আবার বাতিলও করে দেয়। যার বিনিময়ে ওইসব এজেন্সি জিডিএস কোম্পানি থেকে কমিশন পায়।

মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ের এক নিরীক্ষা প্রতিবেদনেও এসেছে, জিডিএস কোম্পানিকে যাচাই ও প্রত্যয়ন ছাড়াই টিকিট বিক্রি, বুকিং ও বাতিল ফি দেয়ায় বছরে প্রায় শত কোটি টাকার অনিয়ম হচ্ছে বিমানে।

সূত্র আরও জানায়, বিমানের টিকিট ব্লক করে কালোবাজারে বিক্রির মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি দুর্নীতি হয়েছে। এর মাধ্যমে আশরাফুল আলম ও শফিকুল ইসলামের সিন্ডিকেট শত শত কোটি টাকা পকেটস্থ করেছে। বিদেশে টাকা পাচার করেছে। বিমান মন্ত্রণালয় অনুসন্ধান করে নিশ্চিত হয়েছে চক্রটি এ প্রক্রিয়ায় প্রতিদিন ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।

গত ২৪ মার্চ বিমান বাংলাদেশ বিমান এয়ারলাইন্স লিমিটেডের টিকিট বিক্রি ব্যবস্থাপনার নানামুখী অনিয়ম-দুর্নীতির বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত সভায় কার্যবিবরণীতে বিস্তর তথ্য তুলে ধরা হয়। বৈঠকে দুর্নীতির ১০টি ধাপ উল্লেখ করে বিমান সচিব সভায় বলেন, বিমানের রিজার্ভেশন বা টিকিট বিক্রি কার্যক্রম সম্পূর্ণ অনলাইনে পরিচালিত হচ্ছে বলে দাবি করা হলেও বাস্তবতা ভিন্ন। বাস্তবে সামান্য কিছু টিকিট অনলাইনে সচল রেখে বাকি টিকিট ব্লক করে রাখা হয়।

অথচ নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি টাকা দিলে টিকিট পাওয়া যায়। এভাবে টিকিট বিক্রি প্রক্রিয়াটি অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন হয়। অনেক সময় অনেক সিট খালি রেখে বিমান যাত্রা করে। দীর্ঘদিনের এমন অভিযোগ সামনে নিয়ে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা ও মন্ত্রণালয় ব্যাপক অনুসন্ধানে নামে। এর ভিত্তিতে টিকিট দুর্নীতির বহু প্রমাণিত তথ্য বেরিয়ে আসে।

এ বিষয়ে তদন্ত সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা সংস্থার একটি সূত্র জানায়, প্রতিদিন বিমানের বিভিন্ন ফ্লাইটে প্রায় ৮ হাজার টিকিট থাকে। এর মধ্যে চক্রটি টার্গেট অনুযায়ী সর্বনিু দামের কয়েকশ’ টিকিট ব্লক করে রাখে। যেগুলো বিভিন্ন এজেন্টের মাধ্যমে বেশি মূল্যে বিক্রি করে। এভাবে তারা প্রতিদিন কমপক্ষে ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকা পকেটস্থ করে

Comments are closed.







পাঠক

Flag Counter



Developed By : ICT SYLHET

Developer : Ashraful Islam

Developer Email : programmerashraful@gmail.com

Developer Phone : +8801737963893

Developer Skype : ashraful.islam625

error: Content is protected !!