কৌশলগত সংলাপ বাংলাদেশ-যুক্তরাজ্যের সম্পর্কের গভীরতার বহিঃপ্রকাশ

প্রকাশিত: ৮:৪২ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ২৬, ২০১৯ | আপডেট: ৮:৪২:অপরাহ্ণ, এপ্রিল ২৬, ২০১৯

ইউকে ইন বাংলাদেশ । ২৬ এপ্রিল। শুক্রবার । ২০১৯।গত ২৪ এপ্রিল ২০১৯ তারিখে বাংলাদেশ সরকারের পদ্মা অতিথি ভবনে তৃতীয় বারের মত বাংলাদেশ ও যুক্তরাজ্য সরকারের মধ্যে কৌশলগত সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়।

বাংলাদেশ-যুক্তরাজ্য কৌশলগত সংলাপের নেতৃত্বে ছিলেন বাংলাদেশ পররাষ্ট্র সচিব (সিনিয়র সেক্রেটারি) মো: শহীদুল হক এবং ব্রিটিশ ফরেন কমনওয়েল্থ অফিসের স্থায়ী আন্ডার সেক্রেটারি স্যার সাইমন ম্যাকডোনাল্ড। ২০১৭ সালে স্যার সাইমন ম্যাকডোনাল্ড এবং মো. শহীদুল হক যৌথভাবে ঢাকায় বাংলাদেশ-যুক্তরাজ্য কৌশলগত সংলাপ শুরু করেন।

বাংলাদেশ-যুক্তরাজ্য কৌশলগত সংলাপ বাংলাদেশ-যুক্তরাজ্যের সম্পর্কের গভীরতার বহিঃপ্রকাশ সরূপ। এই কৌশলগত সংলাপে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, শিক্ষা ও দক্ষতা, সুশাসন এবং মানবাধিকার, উভয় দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার ৫০তম বার্ষিকী উদযাপন, ভবিষ্যৎ উন্নয়নে অংশীদারিত্ব, অভিবাসন, নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, পারস্পরিক স্বার্থের সাথে যুক্ত আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিষয় সম্পর্কে মতামতের বিনিময় হয়। রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধান খুঁজে বের করার বিষয়টি আলোচনার ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব পায়।

বাংলাদেশ ও যুক্তরাজ্য, উভয় পক্ষ তাঁদের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের অগ্রগতিকে স্বাগত জানিয়ে বৈঠক শুরু করে। উভয় পক্ষ তাঁদের দেশীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক কর্মকান্ড বিষয়ে সকলকে অবগত করেন।

যুক্তরাজ্য ও বাংলাদেশ-কমনওয়েলথের সদস্য হিসেবে নিউজিল্যান্ড ও শ্রীলঙ্কার পাশে থাকার বিষয়ে একাত্মতা প্রকাশ করে ও তাদের দেশে ঘটে যাওয়া সাম্প্রতিক সন্ত্রাসী হামলার নিন্দা জানায়। যুক্তরাজ্য ও বাংলাদেশ সন্ত্রাসবাদ ও সহিংস চরমপন্থা থেকে তাঁদের নিজ দেশের নাগরিক তথা বিশ্ব মানবতাকে রক্ষা করার জন্য নিরাপত্তা বিষয়ে পারষ্পরিক সহযোগিতা চালিয়ে যাওয়া সম্পর্কে সম্মতি জ্ঞাপন করে।

যুক্তরাজ্য ও বাংলাদেশ-উভয় পক্ষই সুশাসন, মানবাধিকার, বহুতত্ত্ব, কার্যকরী গণতন্ত্রের জন্য গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের উপর গুরুত্বারোপ করে।

১০ লক্ষেরও বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় প্রদানের জন্যে যুক্তরাজ্য বাংলাদেশের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। রোহিঙ্গা সংকট নিরসন বিষয়ে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে নেতৃস্থানীয় ভূমিকা পালনকারী যুক্তরাজ্যের সকল প্রচেষ্টাকে বাংলাদেশ স্বাগত জানায়। মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের প্রতি সহিংসতার দায় স্বীকার সহ এই সংকট মোকাবেলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধিতে বাংলাদেশ যুক্তরাজ্যের চলমান বৈশ্বিক নেতৃত্বকে অনুরোধ জানায়। স্যার সাইমন ম্যাকডোনাল্ড বিশেষভাবে উল্লেখ করেন যে রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তা প্রদানে যুক্তরাজ্য দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে। এই সংলাপে তিনি রোহিঙ্গা সংকট মোকাবেলায় বাংলাদেশের মানবিক সহযোগিতার প্রক্রিয়ায়, রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছায়, নিরাপদে ও মর্যাদার সাথে টেকসই ভাবে মিয়ানমারে ফেরৎ পাঠাতে যুক্তরাজ্যের দীর্ঘমেয়াদী অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন।

বাংলাদেশ তার নাগরিকদের জন্য, বিশেষ করে ছাত্র ও ব্যবসায়ীদের জন্য, যুক্তরাজ্যের ভিসার আবেদন সম্পর্কিত কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণের উপর জোর দেয়। ঢাকা ও সিলেটের ভিসা আবেদন কেন্দ্রে বাংলাদেশী নাগরিকদের জন্য উচ্চমানের সেবা বজায় রাখার জন্য যুক্তরাজ্য নিজ অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে। স্যার সাইমন ম্যাকডোনাল্ড উল্লেখ করেন যে যুক্তরাজ্যের ভিসা পেতে বাংলাদেশী আবেদনকারীর সংখ্যা প্রতি বছর স্পষ্টত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০১৮ সালে যুক্তরাজ্যের ভিসা পেতে বাংলাদেশী আবেদনকারীর গড় অনুমোদন হার শতকরা ৭০ ভাগ, যেখানে ২০১৬ সালে ছিল ৬১ ভাগ।

এর পাশাপাশি, যুক্তরাজ্যে বসবাস করার অধিকার নেই এমন নাগরিকদের ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য বাংলাদেশের অব্যাহত অঙ্গীকারকে এবং এই বিষয়ে অগ্রগতিকে যুক্তরাজ্য স্বাগত জানায়।

উভয় পক্ষ প্রস্তাবিত ক্রস-বর্ডার উচ্চশিক্ষা বিধি নিয়ে আলোচনা করেন। এই বিধি বাস্তবায়িত হলে যুক্তরাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা বাংলাদেশে পরিচালনার সুযোগ আসবে। বাংলাদেশ এই বিষয়ে একটি সংলাপের প্রস্তাব করেছে। উভয় দেশই যুক্তরাজ্যে অধ্যয়নের জন্য বাংলাদেশী শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করার ব্যাপারে একমত পোষণ করে। বাংলাদেশী শিক্ষার্থীদের জন্য আরো বেশি সংখ্যক বার্ষিক কমনওয়েলথ, চিভেনিং এবং অন্যান্য বৃত্তির বরাদ্দের সুযোগের জন্য বাংলাদেশ যুক্তরাজ্যকে পুনরায় অনুরোধ জানায়। যুক্তরাজ্য জানায় বাংলাদেশী শিক্ষার্থীদের জন্য তাঁরা ইতোমধ্যে শিক্ষা বৃত্তির বরাদ্দ বৃদ্ধি করেছে এবং আরো বেশি সহযোগিতার অনুরোধ বিবেচনা করতে যুক্তরাজ্য ইচ্ছুক।

উভয় দেশ যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশী প্রবাসীদের অব্যাহত অবদানের কথা তুলে ধরে এবং উভয় দেশের মধ্যে অধিকতর সংযোগ স্থাপনের প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে সম্মত হয়। এর পাশাপাশি বাংলাদেশ যুক্তরাজ্যের ‘curry industry’ নামে পরিচিত খাদ্য শিল্পে দক্ষ শ্রমিকের স্বল্পতা, ভবিষ্যৎ অভিবাসনের জন্য হোয়াইট পেপারের অংশ হিসাবে প্রস্তাবিত মজুরি কাঠামো নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে।

বিশ্বব্যাংকের “Doing Business Index” এর প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ তার কর্মক্ষমতা উন্নত করার জন্য প্রচেষ্টাকে এই সংলাপে তুলে ধরেছে। এবং উভয় পক্ষ সম্মত হয়েছে যে বাণিজ্য কোন দেশের উন্নয়নের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশক, এবং দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বৃদ্ধি উভয় দেশের জন্য উল্লেখযোগ্য সুবিধা নিশ্চিত করতে পারে।

বাংলাদেশ যুক্তরাজ্যকে অবহিত করে যে বাংলাদেশ অক্টোবর/নভেম্বর ২0১৯-এ লন্ডনে ‘Bangladesh Trade and Investment Expo’ আয়োজন করবে। যুক্তরাজ্যও বাণিজ্যিক সংযোগ এবং বিনিয়োগ প্রবাহকে উন্নীত করার জন্য এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে। উভয় দেশ তাদের মূল চেম্বার অফ কমার্সের মধ্যেকার সমন্বয় বৃদ্ধি করার ব্যাপারে বিবেচনা করতে একমত পোষণ করেছে।

টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট অর্জনের লক্ষ্যে উভয় দেশ দীর্ঘমেয়াদী প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট অর্জনের উপায় নিয়ে আলোচনা করে। যুক্তরাজ্য কীভাবে বাংলাদেশের সাথে অর্থনৈতিক, সামাজিক, সুশাসন, জলবায়ু পরিবর্তন সহ সরকারী অগ্রাধিকার সঙ্গে সংলগ্ন উন্নয়ন অংশীদারিত্ব সুদৃঢ় করতে পারে তা তুলে ধরে।

যুক্তরাজ্য ও বাংলাদেশ মনে করে যুক্তরাজ্যে অনুষ্ঠিতব্য বিশ্বকাপ ক্রিকেট উভয় দেশের সাংস্কৃতিক, ক্রীড়া ও মানবিক সম্পর্ক উন্নয়নের একটি উৎকৃষ্ট মাধ্যম।

সংলাপের শেষ পর্যায়ে উভয় দেশই ২০২১ সালে যুক্তরাজ্য-বাংলাদেশ কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজনে সম্মতি জ্ঞাপন করে।

বাংলাদেশ-যুক্তরাজ্য কৌশলগত সংলাপ সম্পর্কে বাংলাদেশ পররাষ্ট্র সচিব মোঃ শহিদুল হক বলেনঃ

“এই সংলাপ বিনিময় অত্যন্ত কার্যকর ও ফলপ্রসূ হয়েছে… দ্বিপাক্ষিক, আঞ্চলিক এবং বহুপাক্ষিক সহ আমরা আমাদের সম্পর্কের সকল দিক নিয়ে আলোচনা করেছি। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে যুক্তরাজ্যের জনগণ ও সরকারের সাথে আমাদের একটি টেকসই, গভীর ও বিশ্বস্ত সম্পর্ক রয়েছে…”

ব্রিটিশ ফরেন কমনওয়েল্থ অফিসের স্থায়ী আন্ডার সেক্রেটারি স্যার সাইমন ম্যাকডোনাল্ড বলেনঃ

“আমি ঢাকায় তৃতীয়বারের মতো বাংলাদেশ পররাষ্ট্র সচিব মোঃ শহিদুল হকের সাথে কৌশলগত সংলাপে অংশগ্রহণ করতে পেরে আনন্দিত। এই আলোচনায় যুক্তরাজ্য-বাংলাদেশ সম্পর্কের গভীরতা ও বিস্তারের স্বরূপ এবং আমাদের এই সম্পর্ক গভীরতর করার আকাঙ্ক্ষা প্রতিফলিত হয়েছে।“