এনআরসি থেকে বাদ ১৯ লাখ: ‘বাংলাদেশের উদ্বিগ্ন হবার যথেষ্ট কারণ রয়েছে’(অডিও)

প্রকাশিত: 10:26 AM, September 2, 2019 | আপডেট: 10:26:AM, September 2, 2019

ভারতের উত্তর-পূর্ব রাজ্য আসামের নাগরিক তালিকা থেকে বাদ পড়া বাংলাভাষী মানুষদের সমস্যা ‘ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়’ বলে মনে করে বাংলাদেশ সরকার।

বিজেপি শাসিত রাজ্য আসামে অতিরিক্ত ৫১ কোম্পানি সিএপিএফ নিযুক্ত করে, কারফিউ ঘোষণা করে, সবরকম নিরাপত্তা নিশ্চিত করে, গতকাল (শনিবার) সকাল ১০টায় চূড়ান্ত জাতীয় নাগরিকপঞ্জি (এনআরসি) প্রকাশ করা হয়। এ তালিকায় বাদ পড়েছেন ১৯ লাখ ৬ হাজার ৬৫৭ জন মানুষ। এদেরকে ‘অবৈধ অভিবাসী’ হিসেবে চিহ্নিত করে বাদ দেয়া হয়েছে।

বাদ পড়াদের মধ্যে রয়েছে ১১ লাখেরও বেশি বাংলাভাষী হিন্দু এবং ছয় লাখের কিছু বেশি মুসলমান। বাকি দুই লাখের মধ্যে রয়েছে বিহারী, নেপালী, লেপচা প্রভৃতি। এরা দীর্ঘদিন ধরে পরিবার পরিজন নিয়ে আসামে বসবাস করে আসছিল।

সম্প্রতি বাংলাদেশ সফরে এসে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর স্পষ্ট করে জানিয়ে গেছেন আসামের এনআরসি তাদের আভ্যন্তরীণ বিষয়।

ড. এ কে আব্দুল মোমেন

গতকাল বিকেলে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে এক অনুষ্ঠান শেষে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন  ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সে বক্তব্যকেই প্রতিধ্বনি করছেন।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন বলেন, ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে আসামের এনআরসির ব্যাপারে উদ্বিগ্নতার ব্যাপারে অবহিত করা হয়েছে। ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বলেছেন, এটি ভারতের একান্ত নিজস্ব ব্যাপার। এর প্রভাব বাংলাদেশের ওপর পড়বে না।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন জানিয়েছেন, ভারতের আসামে জাতীয় নাগরিকপঞ্জি থেকে ১৯ লাখের বেশি মানুষের বাদ পড়ার বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ উদ্বিগ্ন নয়।

এ প্রসঙ্গে সাবেক বিডিআর প্রধান মেজর জেনারেল (অব.) এ এল এম ফজলুর রহমান রেডিও তেহরানকে বলেছেন, বিষয়টি ভারতের আভ্যন্তরীণ বিষয় হলেও  বাংলাদেশের উদ্বিগ্ন হবার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। আসামের নাগরিক তালিকা থেকে বাদ পড়া এ মানুষদের বেশীরভাগ বাংলাভাষী হবার কারণে প্রতিবেশী দেশ হিসেবে আমাদের ওপর এর প্রভাব আসতে পারে।

এনআরসি থেকে বাদপড়া লোকজন আতঙ্কে

ওদিকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেন শনিবার ভারতের নিউজ চ্যানেল টাইমস নাউকে দেয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন,  আসামের এনআরসি যারা বাদ পড়েছেন, তারা কেউ বাংলাদেশি নন।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেন খোলাসা করে বলেন, “এনআরসি থেকে বাদপড়াদের মধ্যে  যদি কোনো বাংলাদেশি বংশোদ্ভুত কেউ থেকেও থাকেন তারা ১৯৪৭ সালের কিংবা ১৯৭১ সালের পূর্বে সেখানে গেছেন। ফলে তারা বছরের পর বছর ধরে সেখানে বাস করছেন। আমি তাদের বাংলাদেশি বলে মনে করি না।“

এ বিষয়ে সাবেক পররাষ্ট্র সচিব এম তৌহিদ হোসেন গণমাধ্যমকে বলেছেন, এনআরসি ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় হয়ে থাকলে কোনও সমস্যা নেই। কিন্তু শঙ্কার জায়গা তৈরি হয় যখন ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ প্রকাশ্যে এ বিষয়ে কথা বলেন এবং বাদপড়া লোকগুলো “বাংলাদেশ থেকে অনুপ্রবেশকারী” বলে অভিহিত করেন।

তিনি বলেন, আমাদের সজাগ থাকতে হবে। কারণ আমরা চাই না অমিত শাহ ও বিজেপি’র অভ্যন্তরীণ রাজনীতির কারণে এই লোকগুলো আমাদের ঘাড়ে চেপে বসুক। আমাদের পার্শ্ববর্তী রাজ্যগুলোতে বাংলাদেশি কার্ড যেন ব্যবহার করা না হয় সেজন্য আমাদের সজাগ থাকতে হবে বলে তিনি মনে করেন।

এ প্রসঙ্গে চীনে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত মুনশি ফায়েজ আহমেদ বলেছেন, এনআরসি তালিকা থেকে বাদপড়া এই লোকগুলো অনেক আগে থেকে আসামে বসবাস করে আসছে। স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় তাদের নাগরিক হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু বাংলাদেশের পাশের রাজ্যে বিজেপিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলো বাংলাদেশিদের নিয়ে রাজনীতি করে ভোট বাড়ানোর চেষ্টা করে। এ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে এই লোকগুলোকে নাগরিক করা হয়নি। ভারত যদি মিয়ানমারের মতো তাদের এই ‘অবৈধ’ লোকগুলোকে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে তাহলে দেশটির সঙ্গে আমাদের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

বিজিবি সতর্ক

সীমান্তে সতর্কতা

ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসামে প্রায় বিশ লক্ষ নাম বাদ দিয়ে নাগরিকদের  চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ  হওয়ার পর সিলেটের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। জেলার সীমান্তবর্তী থানা এলাকাগুলোতে বিজিবির পাশাপাশি পুলিশও সতর্ক রয়েছে যাতে সীমান্ত পথে কেউ বাংলাদেশে ঢুকতে না পারে। সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোতে বসবাসকারীদের বিজিবির পক্ষ থেকে সতর্কতামূলক বিভিন্ন নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

সীমান্ত এলাকায় যেকোনও অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে বিজিবি সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়েছে বলে জানিয়েছেন ব্যাটালিয়নের (১৯ বিজিবি) পরিচালক লে. কর্নেল সাঈদ হোসেন। তিনি জানান, তালিকা আসামের হলেও সিলেট সীমান্তে যাতে এর কোনও প্রভাব না পড়ে সেদিকে লক্ষ্য রেখে ব্যাটালিয়ন-১৯ এর আওতাধীন সীমান্তে থাকা বিজিবিকে সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া আছে।

ভারতীয় বিএসএফ এবং ভারতীয় নাগরিকদের কোনও তৎপরতা দেখার সঙ্গে সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিজিবি ক্যাম্পকে অবহিত করার জন্য বলা হয়েছে