সিলেট আওয়ামী লীগের বর্ধিত সভায় তুমুল হট্টগোল

প্রকাশিত: ৯:৩৬ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২, ২০১৯ | আপডেট: ৯:৩৬:অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২, ২০১৯

ওয়েছ খছরু, সিলেট থেকে | ৩ অক্টোবর ২০১৯, বৃহস্পতিবার-কেন্দ্রীয় নেতাদের সামনেই তুমুল হট্টগোলে জড়িয়ে পড়লেন সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের নেতারা। রিপোর্ট পেশ করতে গিয়ে কয়েকটি ইউনিটের নেতারা একজন আরেকজনের প্রকাশ্য বিরোধিতা করেন। এমনকি মাইক নিয়েও টানাটানি করেন। এ ঘটনা গতকাল সিলেটের কবি নজরুল অডিটোরিয়ামে ঘটেছে।

এতে বিব্রত হন কেন্দ্রীয় নেতারা। আর এ ঘটনার জন্য তারা জেলার নেতৃত্বকে দায়ী করেন। ৮ বছরের শাসনে মাত্র ৬টি কমিটি গঠন করায় তিরস্কারও করেন তারা। জানান- আগামী মাসেই যেন হয় সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের  সম্মেলন। সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের বর্তমান কমিটির মেয়াদ ৮ বছর অতিক্রম করেছে।

এরমধ্যে দলের ভেতরে কোন্দল, বিভেদ চরম আকার ধারণ করেছে। ‘স্বার্থ’ নিয়ে উপজেলা পর্যায়ের নেতাদের মধ্যে মুখ দেখাদেখিও বন্ধ। গ্রুপে-গ্রুপে ভাগ হয়ে পড়েছেন নেতারা। এমন অভিযোগ আগে থেকেই রয়েছে সিলেট আওয়ামী লীগে। এই অবস্থায় সর্বশেষ উপজেলা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দলের ভেতরে কোন্দল বাসা বেঁধেছে। এতে বিতর্কিত হয়ে পড়ছেন কয়েকজন এমপিও। এই যখন অবস্থা তখন সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের বর্তমান হালহকিকত জানতে গতকাল আয়োজন করা হয় বর্ধিত সভা। এই সভায় কেন্দ্রীয় নেতা তোফায়েল আহমেদ, মাহবুব-উল- আলম হানিফসহ সিনিয়র নেতারা উপস্থিত হন। বর্ধিত সভায় গোটা জেলার সবক’টি ইউনিটের নেতারা আসেন কবি নজরুল অডিটোরিয়ামে।

কেন্দ্রীয় নেতাদের উপস্থিতিতে নিয়ম অনুয়ায়ী সিলেটের সাধারণ সম্পাদক শফিকুর রহমান চৌধুরী জেলা কমিটির সাংগঠনিক রিপোর্ট পেশ করেন। তিনি ৮ বছরে সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের কার্যক্রমের খতিয়ান তুলে ধরেন। বক্তৃতাকালে তিনি সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের কমিটিকে একটি গতিশীল ও শক্তিশালী সাংগঠনিক কাঠামোর ইউনিট বলে জানান। কিন্তু তার বক্তব্যের পর পরই সিলেটে উপজেলা পর্যায়ে ইউনিটদের রিপোর্ট জানতে চান কেন্দ্রীয় নেতারা। ফলে প্রথমে বিশ্বনাথ থানার কমিটির সভাপতি আলহাজ পংকি খানকে তার রিপোর্ট পেশ করার আমন্ত্রণ পান। পংকি খান যখন মাইকে সাংগঠনিক রিপোর্ট প্রকাশ করতে যান তখন নিজ আসন থেকে উঠে যান বর্তমান ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক ফারুক আহমদ। তিনি কেন্দ্রীয় নেতাদের সামনেই জানান- পংকি খান বিএনপি থেকে আওয়ামী লীগে অনুপ্রবেশকারী।

সে এক সময় ইলিয়াস আলীর মানুষ হিসেবে বিশ্বনাথে বঙ্গবন্ধু ও প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে নানা মন্তব্য করেছে। সে উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ছিল বলে জানান ফারুক। এ সময় তিনি সাংগঠনিক রিপোর্ট প্রদানের জন্য তাকে সুযোগ দেয়ার দাবি তুলেন। একপর্যায়ে তুমুল হট্টগোল শুরু হলে কেন্দ্রীয় নেতারা বিষয়টিতে হস্তক্ষেপ করেন। ফারুক আহমদকে দমিয়ে দিয়ে তারা পংকি খানের রিপোর্ট শুনেন। উল্লেখ্য- বিশ্বনাথের সভাপতি পংকি খান হচ্ছেন শফিকুর রহমান চৌধুরী আর সাধারণ সম্পাদক ফারুক আহমদ হচ্ছে আনোয়ারুজ্জামানের অনুসারী। বিশ্বনাথ আওয়ামী লীগে দুই চৌধুরী গ্রুপের নেতারা বিভক্ত অবস্থায় রয়েছে। বিশ্বনাথের পর সাংগঠনিক রিপোর্টের জন্য ডাকা হয় বিয়ানীবাজারকে। বিয়ানীবাজারের সভাপতি আবদুর হাসিব মনিয়াকে সাংগঠনিক রিপোর্ট প্রদানের জন্য ডাকা হয়। এতে বাধা দেন সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমান। সাধারণ সম্পাদক হিসেবে তিনি রিপোর্ট পেশ করবেন বলে জানান। এ নিয়েও পেছন থেকে হৈ-চৈ শুরু হলে কেন্দ্রীয় নেতারা সাধারণ সম্পাদককে রিপোর্ট প্রদানের জন্য নির্দেশ দেন। ফলে আতাউর রহমান সাংগঠনিক রিপোর্ট পেশ করেন। উল্লেখ্য- বিয়ানীবাজারে নাহিদ ও সারওয়ার বলয় নামে আওয়ামী লীগের দুটি গ্রুপ রয়েছে। এই দুই নেতায় বিভক্ত হয়ে পড়েছেন এ আসনের আওয়ামী লীগের নেতারা।

ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগও মেয়াদোত্তীর্ণ। সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক ছাড়া কমিটিতে আর কারো নাম উল্লেখ নেই। এ উপজেলার রিপোর্ট প্রদানের জন্য সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক দু’জন থেকে যেকোনো একজন ডায়াসে আসার আমন্ত্রণ জানানো হয়। কিন্তু রিপোর্ট প্রদানের ডায়াসে ছুটে যান সভাপতি শওকত আলী ও সাধারণ সম্পাদক আবদুল বাছিত টুটুল। দু’জন রিপোর্ট প্রদানের জন্য মাইক নিয়ে টানাটানি করেন। এ দৃশ্য দেখে ক্ষোভ ঝাড়েন কেন্দ্রীয় নেতারা। পরে তাদের হস্তক্ষেপে সাংগঠনিক রিপোর্ট পেশ করেন সভাপতি শওকত আলী। একই ভাবে দক্ষিণ সুরমা উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের মধ্যে যে কোনো একজনকে। ঘোষণা শুনে মঞ্চে যান ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সাইফুল ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক রইস আলী। দু’জনই রিপোর্ট প্রদান করতে চান। এ নিয়ে হট্টগোলের সৃষ্টি হয়। বিষয়টি দৃষ্টিকটু হওয়ার পর কেন্দ্রীয় নেতারা আর কোনো উপজেলা কমিটির রিপোর্ট শুনতে আগ্রহ দেখাননি। ফলে দক্ষিণ সুরমার রিপোর্ট না শুনেই জেলা পর্যায়ের সিনিয়র নেতাদের মঞ্চে বক্তৃতার জন্য ডাকা হয়। এদিকে- জেলা আওয়ামী লীগের বর্ধিত সভায় এমন হট্টগোলের ঘটনায় বক্তৃতা কালে ক্ষোভ ঝাড়েন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল- আলম হানিফ এমপি।

তিনি বলেন- নভেম্বরের শেষ দিকে সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন করা হবে। এর আগে অক্টোবরের মধ্যে সিলেটের যে কয়টি ইউনিয়নে কমিটি নেই সেগুলো করতে হবে এবং পরবর্তীতে উপজেলাগুলোর সম্মেলন করে জেলার সম্মেলন আয়োজন করার জন্য তিনি নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, ২০১৫ সালে সিলেটে এসে শুনে গিয়েছিলাম যে কয়টি কমিটি আছে ২০১৯ সালেও এসে শুনি এগুলোই আছে। নতুন করে কোনো ইউনিটের কমিটি করা হয়নি। এটা অবশ্যই ব্যর্থতার পরিচয়। দায়িত্বশীলদের উচিত ছিল এই ব্যর্থতার দায় নিয়ে পদত্যাগ করা। হানিফ বলেন, সিলেটে যে কয়বার সভা করতে আসি, শুনি আপনারা ঐক্যবদ্ধ হবেন। কিন্তু আজও আপনারা ঐক্যবদ্ধ হতে পারেন নি। সভায় প্রধান অতিথির বক্তৃতাকালে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য সংসদ সদস্য তোফায়েল আহমেদ বলেছেন- ‘আমরা বঙ্গবন্ধুর সৈনিক। এই মহান নেতার কর্মী হিসেবে আমরা যেন কলুষিত না হই, আমরা যেন কলঙ্কমুক্ত থাকি। সেদিকে সবাইকে খেয়াল রাখতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘সিলেটে কোনো কোনো উপজেলায় কমিটি নাই, কোনোটায় অপূর্ণাঙ্গ; এটা ঠিক না। কমিটি করলে পূর্ণাঙ্গ করতে হবে। অপূর্ণাঙ্গ কমিটি করে রাখা ঠিক না।’