রোহিঙ্গা হাকিম ডাকাতের কাছে জিম্মি ২১ দিন স্বপ্ন ভঙ্গ প্রবাসীর

প্রকাশিত: ৬:৩৫ পূর্বাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ৭, ২০২০ | আপডেট: ৭:০৬:পূর্বাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ৭, ২০২০

জাফর মিঞা (ছন্দ নাম) তার বিদেশ যাওয়া নিয়ে এখন দ্বিধা-সংশয়ে আছে। গত কিছু মাসেক আগে রোহিঙ্গা হাকিম ডাকাত জাফর মিঞা-কে তুলে নিয়ে বাম হাতের এক বৃদ্ধ আঙ্গুল কেটে ফেলে। এখন এ নাই বৃদ্ধ আঙ্গুল ছাড়া ইমিগ্রেশন পার হতে পারবে কিনা সন্দেহীনে পড়েছে জাফর মিঞা।

জাফর মিঞা উমরা ভিসা নিয়ে সৌদিতে গিয়েছিল কয়েক বছর পূর্বে। সৌদি হুকুমত ঘোষণা করল যে একামাওয়ালা ব্যতীত ভিসাহীনদেরকে মাত্র নির্দিষ্ট কয়েক মাসের মধ্যে সৌদি ত্যাগ করতে হবে, নইলে কঠিন শাস্তির ভোগ করতে হবে।
জাফর মিঞাও সৌদি হুকুমতের এই হুকুম পালনের জন্য বাধ্য হলেন। চিন্তা করলেন দেশে ফিরে যাবে কিন্তু বিদেশে থাকা মানুষটি দেশে কিবা করবে দেশের অর্থনৈতিক অনেক মন্দা। তাই তিনি সৌদিতে বসে সৌদি ভিসা পাক্কা রেডি করে দেশে চলে এসেছেন।
দেশ থেকে ভিসা রেডি করে আবার নতুন করে সৌদিতে ফিরবে এই আশা নিয়ে। কিন্তু এ আশা আর হচ্ছে না, এই আশা যেন এখন দুরাশা।
রোহিঙ্গা হাকিম ডাকাত তার সেই আশা, ভবিষ্যৎ সব চূর্ণবিচূর্ণ করে ফেলেছে।
দেশে এসেছে কয়েক মাস গত হয়ে গেছে। সৌদিতে যাওয়া দিন গুলোও দিন দিন নিকটে আসতেছে। প্লেনে উঠানো টা বাকি এখন, বাকি সব কাজ তিনি ফাইনাল করে ফেলছে।
দেশে এসেও তিনি বসে থাকেন নি। পরিবারের দু মোটো আহার তুলে দেওয়ার জন্য পরিশ্রম করে গেছেন। হালচাষের জন্য কিনেছেন বড় বড় মহিষ।
এই মহিষই আজ তার স্বপ্ন কে তচনচ করে দিয়েছে। দুইদিন ধরে মহিষ গুলো বাড়িতে ফিরছে না। বাহির হয়ে পড়েছেন পাহাড়ে, মহিষের খোজ সন্ধানে।
জাফর মিঞা একা না, লগে ছিল সাথী হিসেবে পঞ্চাশের এক বৃদ্ধ।
সন্ধ্যা ফেরিয়ে কতরাত যে চলে গেছে মহিষ ফেরার ত দুরের কথা, মহিষ খোজের জন্য যারা গেছেন তারাও ফেরেনি বাড়িতে। পরিবার কি জানে মহিষ সন্ধানী লোকগুলিকে হাকিম ডাকাতের দল তুলে নিয়ে গেছে।

জাফর মিঞা আর তার সাথী সেদিন পাহাড়ে বেরিয়েছিলেন মহিষের খোজে। এখন পরিবার বেরিয়েছেন মানুষগুলির খোজে।
যখন সন্ধ্যা নেমে আসল তখনো তারা মহিষের কোনো সন্ধান না ফেয়ে হতাশ হয়ে বাড়ি ফেরার পথে পাহাড়ে উৎ পেটে থাকা ডাকাত গুলো দু’জন কে পেছন থেকে জাপড়িয়ে ধরে ফেলে। জাফরের মনে তখনো জানা ছিল না যে তারা ডাকাতের দল, পরিচিত কেউ হবে এমন মনে করে ছেড়ে দিতে বলে।

কে শুনে কার কথা,
রোহিঙ্গাদের আছে কি কোন মানবতা।
শিকার শিকারই। বাঘ যখন মহিষ শিকার করে, কুমির যখন হরিণ শিকার একটি পাইলে আর ছাড়াছাড়ি নাই। তেমনি রোহিঙ্গা হাকিম ডাকাতদের পেশা মানুষ শিকার। এই দ্বি-শিকার কে নিয়ে যাওয়া হয় ডাকাতের আস্তানাতে। তিনি দেখলেন বেশ অস্ত্র-সজ্জ নিয়ে সাজানো আস্তানা। তখনো তাদের মনে সন্দেহ আমরা এখন রোহিঙ্গা হাকিম ডাকাতের কবলে পড়েছি, আমাদের কিডনাপ করা হয়েছে।
জীবন নিয়ে ফেরা, না ফেরা মহান আল্লাহ ব্যতীত কেউ জানে না।
তুলে প্রথমে অত্যাচার করতে লাগলেন মুক্তিপণের দাবিতে। দু’জন থেকে মুক্তিপণ ২০ লাখ টাকা দাবি করে। না দিলে মৃত্যু ছাড়া কোন উপায় নাই।
কিছুদিন পরে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে দেওয়া হয় এবং ২০ লাখ টাকা যোগাড় করতে বলে পরিবার কে।
পরিবার যোগাযোগ করে, পুলিশ, র্যাব, বিজিবি’ কাছে।
র্যাবও খুজে বের হলেন তাদের সন্ধানে, অস্ত্র-সস্ত্র নিয়ে। তাদের হেলিকপ্টার নিয়ে। এত বড় পাহাড়, বনে জঙ্গলে আবদ্ধ যেন এক আমাজন বন।
প্রশাসনও সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়ে নিজেদের ক্যাম্পে ফিরে গেলেন।
এদিকে টাকার কোন খবর বাত্রা নাই। প্রশাসনের সাহায্য সহযোগিতার আশাও ছেড়ে দিলেন। এত্ত টাকা কোথায় পাবে হঠাৎ, পরিবারও তাদের জীবিত অবস্থায় ফিরে ফেতে চাই। এদিক-সেদিক দু’জনের জন্য টাকা যোগাড় হয়েছে মাত্র ১৪ লাখ টাকা তাও অনেক দেরিতে। ততক্ষণে জাফর মিঞার বাম হাতের বৃদ্ধ আঙ্গুল একটি নাই।
একটি কাঠে বাম হাতের বৃদ্ধ আঙ্গুল টি রেখে কল দিতে বলে বাড়িতে। আঙ্গুল কাটার কান্নাটি পরিবার কে শুনাবে।
– তোমরা তাড়াতাড়ি টাকা যোগাড় কর, নইলে আমাকে মেরে ফেলবে তারা। আমার হাত একটি কেটে ফেলতেছে এখন।
– হঠাৎ জাফর মিঞার কান্নার আওয়াজ। শরীর থেকে আঙ্গুল একটি বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছে। কেটে দেওয়া হয়েছে মোবাইল কল।

২১ দিনে জাফর মিঞা একদিনও ভালো করে ঘুমাতে পারে নি। পারে নি ভালো করে খেটে, পারে নি ভালো করে প্রস্রাব-পায়খানা করতে। যেদিকে যায় শুধু পাহারা দিয়ে রাখত। খাবার হিসেবে খেতে দিত মাংস। নিজের কাপর ছাড়া আর কোনো কাপর পড়তে দেইনি, শীতের কাপড়ও কোন দেওয়া হয়নি। ২১ দিনে বাড়ি ফিরেছে কঙ্কাল হয়ে।
কোন রকমে জাফর মিঞার পরিবার ৭ লাখ আর বৃদ্ধের পরিবার ৭ লাখ ব্যবস্থা করেছে।

প্রশাসন কে না জানিয়ে এক সন্ধ্যায় ১৪ লাখ টাকা নিয়ে দুটি মানুষ পাহাড়ের দিকে হাঁটতে লাগলেন। কোনো প্রশাসনের সাহায্য ছাড়াই। যেতে যেতে পাহাড়ের ডালায় পৌছে যায় ১৪ লাখ টাকা বহনকারী। দুর থেকে ডাকাতেরা তাদের লক্ষ করতেছে। দুটি মানুষ ছাড়া আর কাউকে দেখা যাচ্ছে না?
নির্দিষ্ট জায়গা দেখিয়ে টাকাগুলি রেখে চলে যেতে বলে এবং পরপরেই ৬ রাউন্ড গুলি আকাশের দিকে ছুঁড়ে মারে।
ডাকাতরা টাকা পেয়ে দ্বি-শিকারী-কে ছেড়ে দেয়। ২১ দিন পরে পরিবার ফিরে পায় মহিষ সন্ধানের দ্বি সন্ধানী-কে।

এখন জাফর মিঞা সবচে দ্বিধায় পড়েছে তার বিদেশ যাওয়া নিয়ে। আঙ্গুলের ছাপ ছাড়া বাংলাদেশের এয়ারপোর্ট ছাড়তে চাইবে কিনা, যদিও ছাড়ে সৌদি ইমিগ্রেশন তা কতটুকু গ্রহণে নিবে।
৭ লাখ টাকা ঋণ, সৌদি যেতে টাকা জমা দেওয়া এবং হাতের প্রধান একটি আঙ্গুল না থাকা নিয়ে হতাশায় দিন কাটছে জাফর মিঞা’ র।

ভিক্টিমের জবানবন্দীতে: লেখক সাইফুল ইসলাম।