বাবা

প্রকাশিত: ৫:৫৯ পূর্বাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ২৬, ২০২০ | আপডেট: ৫:৫৯:পূর্বাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ২৬, ২০২০

বাবা
তালুকদার তুহিন


এই পৃথিবীর সবচেয়ে মধুর ২ টা শব্দের একটা হলো বাবা।
নিজের বাবার কথাই বলি,আমার বাবা সিলেটের হবিগঞ্জ এলাকার এক সম্ভ্রান্ত জমিদার পরিবারের সন্তান।ছোট বেলাতেই উনি সিলেট চলে আসেন।পরবর্তীতে মাকে বিয়ে করেন এবং সিলেটের মাটিতেই স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন।যার সুবাধে আমাদের সব ভাইবোনের জন্ম সিলেট।
মূল প্রসঙ্গে আসি,বাবা বৃদ্ধ হয়ে যাওয়ার পরে উনি বাসাতেই বেশি সময় কাটাতেন এবং আমাদের সাথে গল্প করতে চাইতেন।আমরাও বিভিন্ন ব্যস্ততার কারণে উনাকে সময় দিতাম না সত্যি কথা বলতে সন্তানের সঠিক দায়িত্ব পালন করতাম না।উনার একটা অভ্যাস ছিল,গ্রামের কোন আত্মীয় অথবা পরিচিত কেউ আসলেই আমাদের শহরের বাসায় থাকতে বলতেন এবং টাকা না থাকলেও যাওয়ার সময় ধার করে হলেও কাপড় কিনে দিতেন।বিষয়টা আমাদের পরিবারের অনেকেরই পছন্দ হতো না,আমরা মধ্যবিত্ত আর পাশাপাশি শহুরে মন মানসিকতা বড় হয়েছি তাই ঝামেলা মনে করতাম।এরকম একবার গ্রামের দুইটা ছেলে তাদের বাবাকে নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করালে বাবা ছেলেগুলোকে বললেন আমাদের বাসায় থাকা এবং খাওয়ার ব্যবস্থা করতে।আমরা বিষয়টা না জেনেই খুব বিরক্ত হচ্ছিলাম।বাবা তখন বলতেন আমি যখন থাকবোনা তখন বুজতে পারবে এই বিষয়গুলোর মর্ম।পরে শুনতে পারলাম,ছেলে দুইটার বাবার ক্যান্সার ছিল এবং উনি মারা গিয়েছেন।শহরে দেখতাম চা-ওয়ালা থেকে শুরু করে অনেকেই বাবাকে খুব পছন্দ করতো।বাবা মৃত্যুর আগে আমাদের বলে গিয়েছিলেন তার কবর যেন আমাদের গ্রামের বাড়িতে পারিবারিক গোরস্থানে করার হয়।তারপর বাবা ঐ বছর  জানুয়ারি মাসে মারা গেলেন।শহরে জানাজা পড়া এবং কবর দেওয়ার কথা ভাবলেও, বাবার কথা রাখতে আমরা গ্রামের বাড়িতে বাবার লাশ নিয়ে গেলাম।চাচাদের কথা অনুযায়ী ফজরের নামাজের কিছু পরে জানাজা পড়ানোর সিদ্ধান্ত হলো।রাত তিনটায় হঠাৎ দেখি চিৎকার করে আর্তনাদ করতে করতে ঐ দুই ছেলে যারা আমাদের বাসায় মেহমান হয়েছিল বাবার লাশ দেখে কান্না করছে।শুনলাম তারা ঢাকা থেকে এই গভীর রাতে দূর্গম রাস্তা অতিক্রম করে এসেছে শুধু বাবার জন্য।ভুলেই গিয়েছিলাম বাবার সন্তান আমি নাকি এই দুই ভাই।আমিই কাঁদছিলাম এবং লজ্জাও লাগছিলো।এরা বাবাকে কতটা ভালবাসে,সকালে চাচারা যখন কবর খুড়ার মানুষ খুজছিল,এই দুই ভাই বললো আমাদের চাচার কবর আমরা খুড়বো।বাবার কথার মানে তখন বুজেছিলাম।রাতে বাবার লাশের পাশে একাই বসে ছিলাম,মাঝেমধ্যে কাফনের কাপড় সরিয়ে মুখটা দেখতাম।নীরব,নিথর এই মুখটা আর কোনদিন দেখা হবেনা।
সকালে জানাজা, মনে মনে ভাবলাম এই জানুয়ারি মাসের শীতের সকালে কে আসবে এত ঠান্ডায় জানাজা পড়তে।কিন্তু তখনও অবাক হওয়ার পালা।পুরো ফুটবল খেলার মাঠ ভরে গেল,তাও মানুষ দলে দলে আসছে,কিছুটা অনুভব করছিলাম বাবার কথা।আমার চোখে তখনও পানি আসেনি,আমার এক চাচা সরকারি রিটায়ার্ড কর্মকর্তা উনাকে ধরে রাখতে বললেন,চাচার দাড়িয়ে থাকতে কষ্ট হচ্ছিলো।উনি বললেন উনি বাবা থেকে বয়সে বড়।আমি ধরে ছিলাম চাচাকে কিন্তু কিছুই ভাবছিলাম না।বাবাকে যখন কবরে রাখা হচ্ছিলো,বড় ভাইকে কোন অবস্থাতেই বের করে আনা যাচ্ছিলো না কবর থেকে,নিশ্চয়ই বাবা তাকে অনেক ভালবাসতেন।বাড়িতে আসার পর এক মহিলা আমাকে জড়িয়ে ধরলেন সাদা শাড়ি পড়া।আমার খুব অস্বস্তি হচ্ছিলো।ভালো করে তাকাতেই দেখি ইনি আমার মা।কিচ্ছু বলার ভাষা ছিলো না।বাবা মারা যাওয়ার পর সবচেয়ে বেশি অসহায় ইনি(মা)যাকে বাকি জীবন একাই কাটাতে হবে।জানাজা শেষে শহরে অাসার পর এক চা-ওয়ালা দৌড়ে এলো কাদঁতে কাদঁতে,বললো,”ভাই,চাচা মারা গেছেন,অামাকে একবার জানালেন ও না।”উনি জড়িয়ে ধরলেন,আমার আসলে তখন উনার মাথায় হাত বুলিয়ে দেওয়া ছাড়া কিচ্ছু করার ছিলো না।
বাবাদের গল্প বলে শেষ  করা যাবেনা,শহরের নামি-দামি স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে একসাথে পাঁচ ভাইবোন পড়াশোনা করাতে বাবাকে হিমশিম খেতে হতো,চেহারায় যেটা প্রকাশ পেত না।ইদের সময় মা সহ আমরা সব ভাইবোন যখন ইদের জামা পড়ে বের হতাম,বাবা তখন পুরনো ইস্ত্রি করা পাঞ্জাবি পড়ে এক কোনে বসে সিগারেট ফুকতেন।তখন না বুঝলেও এখন বুঝি।
এই গল্পটা যে শুধু আমার তা কিন্তু নয়,পৃথিবীর প্রতিটি সন্তানকে জিজ্ঞেস করুন,সে গর্বভরে তার বাবার কথা বলে যাবে।বাবারা এমনই।শ্রদ্ধা জানাই পৃথিবীর সকল বাবাকে।

লেখক: প্রভাষক(ইংরেজি), সভাপতি, সাকসেস হিউম্যান রাইট সোসাইটি, সিলেট।